প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

দেবীদ্বারে মাদকবিরোধী বিক্ষোভে বাড়ি ভাঙচুর, পরিবার গ্রামছাড়া

দেবীদ্বারের নোয়াবগঞ্জ (কোটনা) গ্রামে কথিত মাদক কারবারি কাজী এনামুল হকের বাড়িতে ভাঙচুরের দুই দিন পর তোলা ছবি।
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক :

প্রায় সহস্রাধিক মানুষের বিক্ষোভ; ভাঙচুরের ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি

কুমিল্লার দেবীদ্বারে মাদকবিরোধী বিক্ষোভের এক পর্যায়ে কথিত মাদক কারবারির বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও তছনছের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় সহস্রাধিক মানুষ মাদকবিরোধী মিছিল নিয়ে বাড়িটিতে হামলা চালিয়ে অন্তত আটটি কক্ষের আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর ওই পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

দৈনিক আজকের কথা
মাদকবিরোধী আন্দোলনের নামে কোনো নিরপরাধ পরিবার যেন হয়রানির শিকার না হয়। প্রকৃত মাদক কারবারি থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে, আর কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটিরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
— স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা

ঘটনাটি ঘটে গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের নোয়াবগঞ্জ (কোটনা) গ্রামের কাজীবাড়িতে। বাড়িটির মালিক অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আলহাজ্ব মাওলানা কাজী আব্দুস সালাম পীর (৮২)।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে একদল লোক ওই বাড়িতে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায়। এ সময় বাড়ির দরবার কক্ষসহ প্রায় আটটি কক্ষ তছনছ করা হয়। ঘরে থাকা খাট, চৌকি, চারটি ফ্রিজ, দুটি সোফাসেট, টেলিভিশন, রান্নাঘর, মাটির চুলা, বাথরুম-টয়লেট, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, ভাঙচুরের সময় বাড়ির মূল্যবান কিছু জিনিসপত্রও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

ঘটনার দুই দিন পর মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটির বিভিন্ন অংশ বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা আসবাবপত্র ও ঘরের বিভিন্ন সামগ্রী। পুরো বাড়িতে ছিল সুনসান নীরবতা। পরিবারের কোনো সদস্যকে সেখানে দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অনেকেই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পঞ্চাশোর্ধ্ব একাধিক প্রতিবেশী দাবি করেন, কাজী আব্দুস সালামের ছেলে কাজী এনামুল হক (৩৩) দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও মদ বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, এনামুল এর আগে মাদক ও নারী নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছেন।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য, গত রমজান মাস ও কোরবানির ঈদের সময় গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে এনামুল ও তার দুই ভাইকে মাদক ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অনুরোধ করা হয়। এমনকি কয়েক দফায় সময় দেওয়ার পাশাপাশি পুনর্বাসন, ব্যবসা কিংবা বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান।

তাদের দাবি, এরপর গত আগস্ট মাসে মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে স্থানীয় মসজিদগুলোতে সভা এবং মাইকিংও করা হয়।

ইয়াবাসহ দুই যুবক আটকের পর উত্তেজনা

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে ওই বাড়ির সামনের এলাকা থেকে ইয়াবাসহ দুই যুবককে আটক করা হয়। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আটক ব্যক্তিরা হলেন—মুরাদনগর উপজেলার উত্তর ত্রিশ গ্রামের মো. রিপন হোসেন (২৮) ও সাগর (২৪)। স্থানীয়দের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তারা কাজী এনামুল হকের কাছ থেকে ইয়াবা কেনার কথা বলেছে এবং বিকাশের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের কথাও জানিয়েছে।

এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর মাদকবিরোধী বিক্ষোভ আরও উত্তাল হয়ে ওঠে। পরে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ মিছিল নিয়ে কাজী এনামুলের বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর চালায় বলে স্থানীয়রা জানান।

তবে এ ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্যও পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি দাবি করেন, এনামুল একসময় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও গ্রামবাসীর সিদ্ধান্ত মেনে তিনি সরে আসার চেষ্টা করেছিলেন। তার ভাষ্য, আটক দুই যুবকের কাছ থেকে এনামুলের নাম আসার পরই মূলত বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।

ওই ব্যক্তি আরও দাবি করেন, আটক যুবকরা প্রকৃতপক্ষে অন্য একটি এলাকার মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে থাকতে পারেন। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, “কাজী আব্দুস সালাম এলাকায় দীর্ঘদিনের সম্মানিত ব্যক্তি। মাদকবিরোধী অবস্থান নিতে গিয়ে তার পরিবারের বাড়িঘর এভাবে ভাঙচুর এবং সবাইকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না। অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

থানায় অভিযোগ নেই, তদন্তের সুযোগ রাখার কথা পুলিশের

এ বিষয়ে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “এনামুল হক একজন নিয়মিত মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলা ও একটি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা রয়েছে।”

বাড়িঘর ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসেছে।”

স্থানীয়দের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর হামলা, ভাঙচুর কিংবা সামাজিকভাবে হয়রানির ঘটনাও যেন না ঘটে—এমন প্রত্যাশা তাদের।

প্রিন্ট করুন