প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

মুরাদনগরে ড্রেজার সিন্ডিকেটে এসিল্যান্ডের হানা—৮ লাখ টাকা জরিমানা, ৪ ড্রেজার ও ২৮০০ ফুট পাইপ অপসারণ

​"জনগণের সেবায় অবিচল: কৃষি জমি ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ।"
আজকের কথা ডেস্ক :

কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর প্রশাসন, সরকারি রাস্তা দখলমুক্তের উদ্যোগ; ‘ড্রেজার-দখলদারদের কাছে এসিল্যান্ড এখন আতঙ্কের নাম’

কুমিল্লার মুরাদনগরে কৃষিজমির বুক চিরে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে উপজেলা প্রশাসন। সংঘবদ্ধ ড্রেজারচক্রের বিরুদ্ধে দিনব্যাপী অভিযানে একটি ড্রেজারের মালিককে ৮ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই অভিযানে তিনটি ড্রেজার ও প্রায় ২ হাজার ফুট পাইপ অপসারণ করা হয়েছে। পৃথক অভিযানে আরও একটি ড্রেজার ও প্রায় ৮০০ ফুট পাইপ অপসারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সরকারি রাস্তার গতিপথ পরিবর্তন, রাস্তা দখল এবং অন্যের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগেও প্রশাসনিক পদক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহলের দখল, অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন ও কৃষিজমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে এবার মুরাদনগরে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দৈনিক আজকের কথা
সরকারের সকল সম্পত্তি, কৃষিজমির উর্বরতা ও টপ সয়েল রক্ষায় প্রশাসন শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে। অবৈধভাবে ড্রেজার চালিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।
— সাকিব হাছান খাঁন
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, মুরাদনগর।

ড্রেজার সিন্ডিকেটে বড় আঘাত

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মুরাদনগর উপজেলার পূর্ব ধইর পশ্চিম ও দারোরা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সাকিব হাছান খাঁন।

অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাঙ্গরা বাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শফিউল আলম, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বাঙ্গরা বাজার থানা এলাকার পূর্ব ধইর পশ্চিম ইউনিয়নের মালিপাড়া ও নবীয়াবাদ এলাকায় কৃষিজমিতে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দিনব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানকালে কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে এক ড্রেজার ব্যবসায়ীকে ৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে তিনটি ড্রেজার এবং প্রায় ২ হাজার ফুট পাইপ অপসারণ করা হয়।

প্রশাসনের এ অভিযানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কৃষিজমিতে ড্রেজার বসিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

মুরাদনগরে ড্রেজার ব্যবসায়ীকে জরিমানা।
মুরাদনগরে ড্রেজার ব্যবসায়ীকে জরিমানা। ছবি: দৈনিক আজকের কথা

দারোরা ইউনিয়নেও ড্রেজারের বিরুদ্ধে অভিযান

অন্যদিকে মুরাদনগর থানাধীন দারোরা ইউনিয়নের বরই বাগান এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি ড্রেজার ও প্রায় ৮০০ ফুট পাইপ অপসারণ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়ার ফলে জমির স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও কৃষিজমি পরিণত হচ্ছে গভীর গর্তে। বর্ষাকালে এসব গর্তে পানি জমে কৃষিকাজ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

কৃষকদের ভাষ্য, একটি জমি থেকে একবার টপ সয়েল তুলে নেওয়া হলে তার স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারি রাস্তা দখলের অভিযোগেও নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন

ড্রেজারবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি সরকারি রাস্তা দখল ও অন্যের জমি দখলের অভিযোগেও প্রশাসনের তৎপরতা শুরু হয়েছে।

দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নায়েব আলী মেম্বারের বিরুদ্ধে প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো একটি সরকারি রাস্তার গতিপথ পরিবর্তন করে জায়গাটি দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই জায়গায় বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছে।

একই এলাকার একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের ক্রয়কৃত জমিও দখলে নিয়ে সেখানে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা ভূমি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সরকারি রাস্তা উদ্ধারের পাশাপাশি অবৈধভাবে দখলে থাকা জমি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

‘রাস্তা দখল করে পুকুর, মাছের প্রকল্প—এবার নজরদারি চাই’

এদিকে মুরাদনগরের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি রাস্তার পাশে পুকুর খনন, মৎস্য প্রকল্প বা ব্যক্তিগত স্থাপনা তৈরির মাধ্যমে সরকারি রাস্তার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত বা সংকুচিত করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও রাস্তার পাশ ঘেঁষে পুকুর খনন করা হচ্ছে, কোথাও রাস্তার জায়গা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রকল্প পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে সরকারি রাস্তার স্থায়িত্ব নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানুষের চলাচল ও যানবাহন ব্যবস্থাপনায়ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কৃষিজমি রক্ষায় যেভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে, একইভাবে সরকারি রাস্তা, খাসজমি ও সরকারি স্থাপনা রক্ষায়ও নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন।

তাদের প্রত্যাশা, রাস্তার জায়গা দখল, রাস্তার গতিপথ পরিবর্তন কিংবা রাস্তার পাশে অবৈধভাবে পুকুর ও মৎস্য প্রকল্প গড়ে তুলে সরকারি সম্পদের ক্ষতি করা হলে সেসব ক্ষেত্রেও দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এসিল্যান্ড অফিস নিয়ে বদলাচ্ছে মানুষের ধারণা

১৯৮৩ সালে মুরাদনগর উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উপজেলা ভূমি অফিস তথা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় ভূমি রাজস্ব, সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ভূমি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে।

তবে স্থানীয় অনেকের মতে, ভূমি অফিসের এসব দায়িত্ব ও এখতিয়ার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন তেমন সচেতনতা ছিল না। ফলে সরকারি জমি, রাস্তা, কৃষিজমি কিংবা ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত ছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মুরাদনগরে ড্রেজারবিরোধী অভিযান, কৃষিজমি রক্ষা এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, ‘এসিল্যান্ড অফিস শুধু ভূমি সংক্রান্ত কাগজপত্রের দপ্তর নয়—সরকারি সম্পত্তি ও সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।’

‘দখলদারদের কাছে যমদূত মুরাদনগরের এসিল্যান্ড সাকিব হাছান খাঁন’—স্থানীয়দের প্রশংসা

ড্রেজারবিরোধী অভিযান ও সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে যেসব এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কৃষিজমি থেকে মাটি-বালু উত্তোলন, রাস্তা দখল কিংবা সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

স্থানীয়দের একাংশ বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে সরাসরি অভিযান এবং আইন প্রয়োগের কারণে অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ী ও ভূমি দখলের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে।

কেউ কেউ তাঁকে রীতিমতো ‘ড্রেজার, ভূমিদখল ও সরকারি সম্পত্তি দখলদারদের জন্য যমদূত’ হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন। তবে এটি স্থানীয়দের মন্তব্য; প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তিকে এ ধরনের বিশেষণে অভিহিত করা হয়নি।

কৃষিজমি বাঁচাতে এখনই কঠোর নজরদারি জরুরি

কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি বা বালু উত্তোলনের কারণে শুধু একটি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের ভবিষ্যৎ আয়, জমির উৎপাদনক্ষমতা এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি বা টপ সয়েলই মূলত জৈব উপাদান ও উর্বরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহন করে। এ স্তর নির্বিচারে সরিয়ে ফেললে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।

মুরাদনগরের মতো কৃষিনির্ভর এলাকায় তাই অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, অভিযোগ যাচাই, দ্রুত আইন প্রয়োগ এবং অভিযানের পর পুনরায় একই স্থানে ড্রেজার বসানো হচ্ছে কি না—তা পর্যবেক্ষণ করা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বর্তমান প্রশাসনের অভিযান যেন বিচ্ছিন্ন কোনো কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থাকে। কৃষিজমি, সরকারি রাস্তা, খাসজমি, সরকারি স্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের বৈধ মালিকানাধীন জমি রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালিত হোক।

প্রশাসনের অভিযানকে স্বাগত, দাবি নিয়মিত অভিযানের

মুরাদনগরে সাম্প্রতিক অভিযানে একটি ড্রেজার ব্যবসায়ীকে ৮ লাখ টাকা জরিমানা, জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ড, একাধিক ড্রেজার ও বিপুল পরিমাণ পাইপ অপসারণ এবং সরকারি রাস্তা উদ্ধারের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ভূমি প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে কৃষিজমি রক্ষা, অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ, সরকারি রাস্তা দখলমুক্ত এবং সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের প্রত্যাশা, মুরাদনগরে অবৈধ ড্রেজিং ও ভূমিদখলের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই কঠোর অভিযান যেন কোনোভাবেই থেমে না যায়।

কারণ কৃষিজমি একবার ধ্বংস হলে শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো এলাকার কৃষি অর্থনীতি। আর সরকারি রাস্তা ও সম্পত্তি দখল হলে ক্ষতি হয় জনগণের সম্পদের। তাই এসব রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের কঠোর, নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই।

প্রিন্ট করুন