জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় পৌরসভার বিশেষ উদ্যোগ
কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে বাগেরহাট পৌর এলাকায় বেওয়ারিশ ও গৃহপালিত কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শহরে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কুকুরের কামড়ে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ উদ্যোগ নিয়েছে বাগেরহাট পৌরসভা।
বুধবার দুপুরে বাগেরহাট পৌরসভা চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে এ টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুম, ভ্যাকসিনেশন বিশেষজ্ঞ ও ডগ এক্সপার্ট টিমের সদস্য সায়মনসহ পৌরসভার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

কুকুরের টিকাদানের মাধ্যমে জলাতঙ্কের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। কার্যক্রমটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিন মাসে টিকা নিয়েছেন ৭ হাজার ৫০০ মানুষ
বাগেরহাটে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা কতটা তীব্র, তা স্পষ্ট হয়েছে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বাগেরহাট হাসপাতালের চিকিৎসা পরিসংখ্যানে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসে অন্তত ৭ হাজার ৫০০ মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নিতে হাসপাতালে এসেছেন।
এ বিপুল সংখ্যক মানুষের কুকুরের কামড়ের শিকার হওয়ার ঘটনা স্থানীয় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের বিচরণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও পথচারীদের মধ্যে বেওয়ারিশ কুকুরের দলবদ্ধ চলাচল নিয়ে আতঙ্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বেওয়ারিশের পাশাপাশি গৃহপালিত কুকুরও পাবে টিকা
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, এ কর্মসূচির আওতায় শুধু বেওয়ারিশ কুকুর নয়, গৃহপালিত কুকুরকেও জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হবে।
এর ফলে শহরের কুকুরের একটি বড় অংশকে টিকাদানের আওতায় আনার মাধ্যমে জলাতঙ্কের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচি বাস্তবায়নে ফেনী থেকে অভিজ্ঞ ‘ডগ এক্সপার্ট টিম’-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে বাগেরহাট পৌরসভা। বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, জনবহুল এলাকা ও কুকুরের বিচরণস্থলে গিয়ে কুকুর শনাক্ত করে টিকা দেবেন।
এ সময় টিমের সদস্যরা কুকুর ধরার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সতর্কতা অবলম্বন করবেন।
কুকুরের কামড়ের আতঙ্ক কমাতে বড় পদক্ষেপ
দীর্ঘদিন ধরেই বাগেরহাট পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে অভিযোগ করে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শহরের বিভিন্ন সড়ক, বাজার, আবাসিক এলাকা ও জনসমাগমস্থলে দলবদ্ধ কুকুরের চলাচল অনেক সময় পথচারীদের জন্য ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে হঠাৎ কুকুর তাড়া করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল—বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সেগুলোকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার আওতায় আনা।
পৌরসভার বর্তমান উদ্যোগে সেই দাবির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
শুধু কুকুরকে টিকা দিলেই শেষ নয়
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কুকুরকে টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কোনো ব্যক্তি কুকুরের কামড়ের শিকার হলে দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার করা, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাগেরহাটে তিন মাসে ৭ হাজার ৫০০ মানুষের টিকা গ্রহণের তথ্যই বলে দেয়, কুকুরের টিকাদানের পাশাপাশি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত টিকা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
নজরদারি ও ধারাবাহিকতা চান নাগরিকরা
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, উদ্বোধনের মধ্যেই যেন কর্মসূচির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না থাকে। পৌর এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডের কুকুরকে টিকাদানের আওতায় আনা এবং পরবর্তীতে নিয়মিতভাবে টিকাদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে টিকা দেওয়া কুকুর শনাক্তকরণ, পরবর্তী পর্যায়ে পুনরায় টিকা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা পর্যবেক্ষণ এবং নতুন বেওয়ারিশ কুকুরের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, একবারের কর্মসূচির চেয়ে ধারাবাহিক টিকাদান ও নজরদারিই জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
জনসম্পৃক্ততা জরুরি
পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কর্মসূচি চলাকালে নাগরিকদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদানকারী দল কোনো এলাকায় কাজ করার সময় তাদের কাজে বাধা না দিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
গৃহপালিত কুকুরের মালিকদেরও নিজেদের পোষা প্রাণীকে টিকার আওতায় আনতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বাগেরহাটে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন অধ্যায়
কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসা নেওয়ার প্রেক্ষাপটে বাগেরহাট পৌরসভার এ উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একদিকে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকাদান, অন্যদিকে গৃহপালিত কুকুরকে টিকার আওতায় আনা—দুই দিক থেকে কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন করা গেলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
তবে কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে টিকাদান কার্যক্রমকে নিয়মিত ও ধারাবাহিক করতে হবে। পাশাপাশি কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত মানুষের জন্য দ্রুত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রমও জোরদার করতে হবে।
বাগেরহাট পৌরসভার এ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্কের বিস্তার রোধই নয়, নগরবাসীর নিরাপদ চলাচল ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

