

সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে। এসব নথি যাচাই-বাছাই করে অনিয়ম বা আইন-বিধির ব্যত্যয় ঘটেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে দুদক।
দুদকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের কাছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চাওয়া হয়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে অধিকাংশ নথি দুদকে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
দুদকের ওই কর্মকর্তা জানান, অনুসন্ধানের স্বার্থেই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র তলব করা হয়েছিল। প্রাপ্ত নথিগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। আইন ও বিধি লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
অনুসন্ধানের জন্য দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। পরদিনই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে বিভিন্ন নথিপত্র চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
এর মধ্যে আসিফ মাহমুদ দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ে সম্পন্ন হওয়া সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত নথি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকের ভিত্তিতে সম্পন্ন বদলির নথিও রয়েছে।
এরই মধ্যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আরও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ জানিয়েছেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। নতুন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে সংযুক্ত করে তদন্ত করা হবে।
নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়ন, ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন টেন্ডার এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের কাছে করা অভিযোগে বিশ্বের পাঁচ দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, এর মধ্যে দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনারও অভিযোগ রয়েছে।

আসিফ একজন টোকাই। যার কাছে এখনো মানুষ রুটি-কলার পয়সা পায়। সেই টোকাই আজ ১৩ হাজার কোটি টাকা সুইস ব্যাংকে পাচার করেছে—এটা কীভাবে সম্ভব? বিষয়টি জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
তবে এসব অর্থ পাচারের অভিযোগ এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান ও যাচাই-বাছাইয়ের পর অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেন হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দ ও অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগে তার বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ও পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার, ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দুদকের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে দুদকের অনুসন্ধানে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগে কখনো ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, কখনো ১১ হাজার কোটি টাকা আবার কখনো ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার কথা বলা হচ্ছে। অভিযোগের অঙ্কের এমন পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকারকে আগে নিজেদের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।

১১ হাজার কোটি টাকার এই সংখ্যাটি আগে ঠিকমতো নিজেদের মধ্যে বসে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়। একবার শুনি ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, এরপর ১১ হাজার কোটি টাকা, আবার কয়েকদিন আগে শুনলাম ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ২ কোটি ৭৬ লাখ থেকে ১১ হাজার কোটিতে উঠে যায়—তাহলে বিষয়টি নিয়ে সরকারের নিজেদের মধ্যে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় কাউকে পাকড়াও করবে, তাহলে এর অনেক পদ্ধতি রয়েছে। আমরা দেখছি আগে দুদক কী কী করছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতীতে যেভাবে দুদককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও একইভাবে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি নিয়েও দুদকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদ ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন, উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি ওই বক্তব্যে নিজের মানহানি হয়েছে বলেও দাবি করেন। পরে ১০ সেপ্টেম্বর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে আইনি নোটিশ পাঠানোর কথাও জানান তিনি।
তবে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান চলছে।
দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অনুসন্ধানে নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাইয়ের পরই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
সমালোচকদের কেউ কেউ আরও বলছেন, আসিফ মাহমুদ ও সরকারের পক্ষ থেকে পরস্পরের সঙ্গে নিগোসিয়েশন বা সমঝোতার মাধ্যমে একের পর এক অভিযোগ ও তদন্তের নাটক সাজানো হচ্ছে—যার শেষ পর্যন্ত বাস্তব কোনো ফল হবে না। তাদের ভাষায়, আসিফের অনিয়ম দূর্নীতি দিনের আলোর মতো সত্য হলেও, অভিযোগের অঙ্ক কখনো হাজার কোটি, কখনো অন্য কোনো পরিমাণ; কিন্তু দৃশ্যমানভাবে দায় নির্ধারণ বা অর্থ উদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ কতটা হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তাদের দাবি, জনগণকে একদিকে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত রাখতে এবং অন্যদিকে মূল বিষয়গুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দিতে সময়-সময় নতুন অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে। ফলে তদন্তের নামে যদি শেষ পর্যন্ত কাউকে দায়ী করা না হয়, অর্থ উদ্ধার না হয় কিংবা কোনো মামলার কার্যকর পরিণতি না আসে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটিই লোক দেখানো ও জনগণের সঙ্গে তামাশা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে আসিফ মাহমুদ ও সরকারের মধ্যে এমন কোনো সমঝোতা হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া না গেলেও সচেতন মহল এটা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াচ্ছেন। অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং তদন্তের প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।