

কুমিল্লার দেবীদ্বারে সন্তান কোলে নিয়ে স্ত্রীর মর্যাদা ও সন্তানের পৈতৃক স্বীকৃতির দাবিতে দুদিন ধরে অনশনে বসেছেন হ্যাপি আক্তার (২৭) নামে এক নারী। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দেবীদ্বার পৌর এলাকার বারেরা গ্রামের বদুরুদ্দি হাজী বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানকে কোলে নিয়ে বাড়ির সামনে অবস্থান করছেন তিনি।
অনশনরত হ্যাপি আক্তারের দাবি, বারেরা গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নান মনু মিয়া (মেম্বার)-এর সৌদি প্রবাসী ছেলে এনামুলের সঙ্গে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে সৌদি আরবে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে একসঙ্গে বসবাস করেন। এর মধ্যে প্রায় এক বছর জেদ্দা শহরের আলকোমরা পানির ট্যাংকের সামনে একটি হোটেলে তারা একসঙ্গে ছিলেন বলেও দাবি করেন হ্যাপি।

হ্যাপি আক্তার বলেন, “আমি এনামুলকে বিয়ে করেছি। এখন আমার সন্তানকে নিয়ে তার বাড়িতে এসেছি। আমি চাই, আমাকে স্ত্রী হিসেবে এবং আমার সন্তানকে তার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হোক।
হ্যাপি জানান, ওই সময় তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন। পরে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এনামুল তাকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন। এরপরও এনামুল তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং নিয়মিত খরচ দিতেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে স্ত্রী হিসেবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের বাড়িতে তুলে নেওয়ার কথা বলা হলেও তা আর বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ হ্যাপির।
হ্যাপির ভাষ্য, স্বামীর সংসারে মর্যাদা এবং সন্তানের পিতৃপরিচয়ের স্বীকৃতির দাবিতেই তিনি এখন এনামুলের বাড়িতে এসে অবস্থান নিয়েছেন। তার দাবি, সন্তানকে নিয়ে সৌদি আরবে নেওয়ার কথা বলে এনামুল তাকে পাসপোর্ট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলেছিলেন। কিন্তু কবে তাকে ও সন্তানকে সৌদি নিয়ে যাবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
নিজের জীবনের অনিশ্চয়তার কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে হ্যাপি বলেন, “আমার জীবন তো শেষ হয়ে গেছে। আগের স্বামীকে তালাক দিয়ে এনামুলকে বিয়ে করেছি। এখন আমার সন্তানকে নিয়ে তার বাড়িতে এসেছি। আমাকে কেন এখানে এসেছি, তা নিয়ে এনামুল ফোনে হুমকি দিচ্ছে বলেও আমি অভিযোগ করছি। আমার মায়ের কাছেও ফোন করে চলে যেতে বলা হয়েছে। আমি চাই, আমাকে স্ত্রী হিসেবে এবং আমার সন্তানকে তার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হোক।”
হ্যাপি আক্তার নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার কলাতলী গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে। তার আগের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, এনামুল বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। স্থানীয়দের ও তার স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে তার আরেকটি সংসার রয়েছে এবং ওই সংসারে দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েও নানা আলোচনা চলছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে এনামুলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেননি। ফোনে তিনি অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এনামুলের বাড়িতে থাকা তার ছোট ভাই সাহাদাত হোসেন বলেন, “ভাই বর্তমানে দেশের বাইরে। বাড়িতে আমি ও আমার মা আছি। হ্যাপি যদি ভাইকে বিয়ে করে থাকেন এবং শিশুটি যদি ভাইয়ের সন্তান হয়ে থাকে, তাহলে ভাই দেশে ফিরলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা যেতে পারে। আমরা এনামুলের স্ত্রী হিসেবে যাকে চিনি, তিনি তার দুই সন্তান নিয়ে আলাদা বাসায় থাকেন এবং মাঝে মাঝে এখানে আসেন।”
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর বারেরা এলাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের কেউ পারিবারিকভাবে বিষয়টির সমাধান চান, আবার কেউ সন্তানের পিতৃপরিচয় ও নারীর বৈবাহিক অধিকারের বিষয়টি আইনগতভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “ঘটনাটি শুনেছি। পারিবারিকভাবে বিষয়টির সমাধান হয়ে গেলে ভালো হয়। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি আইন অনুযায়ী দেখা হবে।