
অডিওটির সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন, এরই মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি; ওসি রাকিবুলের বক্তব্য—ভাইরাল অডিওটি তার নয়, এআই দিয়ে তৈরি
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথিত অডিও নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে লিগ্যাল নোটিশ ঘিরে। অডিওটির সত্যতা, উৎস ও সম্পাদনা নিয়ে এখনো প্রকাশ্যভাবে চূড়ান্ত কোনো ফরেনসিক যাচাই সামনে না এলেও তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে লিগ্যাল নোটিশ দেওয়ার ঘটনায় অনেকে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বরাবর এ নোটিশ পাঠান। নোটিশে কথিত অডিওটির সত্যতা, উৎস, সম্পাদনা বা বিকৃতির সম্ভাবনা যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক প্রমাণ থাকলে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওকে কেন্দ্র করে, যার সত্যতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই আপত্তি জানিয়েছেন, তদন্তের ফল পাওয়ার আগেই গ্রেপ্তারের মতো কঠোর পদক্ষেপের দাবি কতটা যৌক্তিক? বিশেষ করে অডিওটি যদি ব্যক্তিগত কথোপকথনের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে পুরো আলাপ, প্রেক্ষাপট ও বক্তব্যের উদ্দেশ্য বিবেচনা না করে বিচ্ছিন্ন অংশকে কেন্দ্র করে সামাজিক বা আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কতটা গ্রহণযোগ্য—সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।
ওসি রাকিবুল ইসলাম অবশ্য অডিওটির বক্তব্য নিজের বলে স্বীকার করেননি। বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ভাইরাল অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তিনি গণমাধ্যমকে যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রচার না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এমন প্রচারে একজন মানুষের মান-সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবারই ওসি রাকিবুল ইসলামকে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদরদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত অডিওটি আসল কি না, সম্পূর্ণ কথোপকথন কী ছিল, বক্তব্যটি কোন প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছিল এবং সেটিতে আদৌ কোনো আইন বা সরকারি বিধি লঙ্ঘনের উপাদান রয়েছে কি না। প্রযুক্তিগতভাবে অডিও যাচাইয়ের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারকে ভিত্তি করে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য বা অডিও ভাইরাল হওয়ার পর দ্রুত জনমত তৈরি এবং সেই জনমতের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দাবি করার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। অভিযোগের তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে সামাজিক প্রচারই যদি বিচারের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি ব্যক্তি অধিকার ও ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
লিগ্যাল নোটিশে অবশ্যই অডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের দাবি রয়েছে। কিন্তু একই নোটিশে তদন্তের আগেই গ্রেপ্তারের দাবি ওঠায় প্রশ্ন থাকছে—তদন্ত আগে, নাকি সামাজিক প্রচারের ভিত্তিতে শাস্তির দাবি আগে? একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন; একইভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য না করাও আইনের স্বাভাবিক নীতির অংশ।
ওসি রাকিবুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কিংবা অডিওটির প্রকৃত উৎস তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অডিও সত্য হলেও বক্তব্যটি ব্যক্তিগত আলাপের অংশ ছিল কি না, তার পূর্ণ প্রেক্ষাপট কী এবং সেটি কোনো আইন বা বিধি লঙ্ঘন করেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু ভাইরাল হওয়ার ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা বা গ্রেপ্তারের দাবি তোলা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বক্তব্যের সত্যতা যাচাই, পূর্ণ প্রেক্ষাপট প্রকাশ এবং আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ বা অতিরঞ্জিত প্রচারের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।