

কুমিল্লায় গত নয় মাসে ১০৪ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস মৃত্যু কুমিল্লাজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপ্রতিমের মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের নির্জন এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
রোববার সকালে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বজন, পরিচিতজনসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতিতে ঈদগাহ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়রা।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছে লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা। কুমিল্লা শহর, কোটবাড়ি ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন হওয়ায় লালমাই পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে মানুষের চলাচল থাকলেও পাহাড়ের অনেক স্থান এখনো নির্জন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নির্জন এলাকা অপরাধীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে।
লালমাই পাহাড়ে অপরাধের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১০ সালে পাহাড়ের হাতিমারা এলাকা থেকে মেহেদি হাসান নামে এক কিশোর অটোরিকশাচালকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০০৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লালমাই পাহাড়ের মোড় থেকে রিফাত হোসেন নামে আরেক শিশুর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ছাড়া গত ২৯ আগস্ট কুমিল্লার কোটবাড়ির শান্তির মোড় এলাকায় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পাহাড়ের নির্জন স্থানে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বসতিতেও ডাকাতি, ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধের সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পাহাড়কেন্দ্রিক অপরাধচক্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে জেলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১০৪ জন। জেলার সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন, জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি থাকা লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রবেশপথে নজরদারি, নিয়মিত পুলিশ টহল এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সিসিটিভি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যাকাণ্ডের ক্লু শনাক্ত করে প্রকৃত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
একটি শিশুর আকস্মিক ও করুণ মৃত্যু এখন শুধু তার পরিবারকেই শোকাহত করেনি, লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে কুমিল্লাবাসীকে। অপ্রতিমের জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের চোখে ছিল শোক, ক্ষোভ ও দ্রুত বিচারের প্রত্যাশা।
স্থানীয়দের দাবি, অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধ করতে হবে।
অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন কুমিল্লার পাহাড়ি এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নগুলোর স্থায়ী সমাধানের কারণ হয়—এটাই এখন স্বজন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।