

কুমিল্লার দেবীদ্বারে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুই পরিবারের চলাচলের একমাত্র পথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাড়ির চারপাশে টিন, বাঁশ, ঝাটা ও নেটের বেড়া দেওয়ায় গত এক বছর ধরে ওই দুই পরিবারের প্রায় ১৬ সদস্য কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় জীবনযাপন করছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে দেবীদ্বার উপজেলার রাজামেহার ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের আব্দুল খালেকের বাড়িতে। চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ থাকায় বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও শিশু-কিশোরদের বাড়ির পেছনের নিচু জমি ও পুকুরপাড় দিয়ে কোমরসমান পানি পার হয়ে প্রধান সড়কে উঠতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজামেহার গ্রামের বাগনবাড়ির সৈয়দ আলী প্রায় ৫০ বছর আগে ওই বাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী গোবিন্দপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর তিন ছেলে মো. আব্দুল খালেক, মো. শাহজাহান ও মোহাম্মদ আলী এবং দুই মেয়ে আলেখা বেগম ও কাউছার বিবি। কাউছার বিবি প্রতিবন্ধী।
সৈয়দ আলীর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানরা বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেন। বাড়ির সামনের অংশে মেঝো ভাই শাহজাহান এবং পেছনের অংশে আব্দুল খালেক ও মোহাম্মদ আলী বসবাস করতেন। পরে শাহজাহানের মৃত্যুর পর দুই বোনের সম্পত্তি তাঁর অপর দুই ভাই ক্রয়সূত্রে মালিক হন। এরপর থেকেই পারিবারিক বিরোধ আরও তীব্র হয় বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
বিরোধের সমাধানে একাধিকবার সালিশ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে মৃত শাহজাহানের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের সীমানা বরাবর টিনের বেড়া এবং বাড়ির উত্তর পাশে নেটের বেড়া দিয়ে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেন। বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব পাশের একটি পথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলেও আব্দুল খালেকের চাচাতো ভাই আব্দুল হাকিম ওই পথেও টিনের বেড়া ও ঝাটা দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন।
তবে আব্দুল হাকিম বলেন, বাড়ির নারীদের পর্দার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তিনি ওই পথ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
পথ বন্ধ থাকায় দুই পরিবারের সদস্যদের বাড়ির পেছনের পুকুরপাড় ও নিচু জমি দিয়ে কোমরসমান পানি পার হয়ে অনেকটা ঘুরে প্রধান সড়কে উঠতে হচ্ছে। পরিবার দুটির সদস্যদের মধ্যে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও শিশু-কিশোর রয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্বাভাবিক রাস্তা না থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বই-খাতা ও স্কুলব্যাগ হাতে নিয়ে কোমরসমান পানি পেরিয়ে সড়কে উঠতে হয়। এরপর ভেজা কাপড় পরিবর্তন করে স্কুলের পোশাক পরে তাদের বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে।
মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম বলেন, রাস্তার অভাবে বরপক্ষ বাড়িতে আসতে না পারায় তাঁর দুই বিবাহযোগ্য মেয়ের বিয়ে নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁর এক মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী হলেও রাস্তার সমস্যার কারণে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না বলেও জানান তিনি।
ভুক্তভোগীরা আরও বলেন, শুধু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাই নয়, তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতাল, মসজিদ, হাট-বাজার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাতায়াত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না।
আব্দুল খালেক (৭২) বলেন, তাঁদের দুই পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৬ জন। এর মধ্যে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও ছয়জন শিশু-কিশোর রয়েছে, যারা স্কুলে পড়ে। বাড়ির পেছন দিয়ে কোমরসমান পানি পার হয়ে সড়কে উঠতে হয়। এরপর কাপড় পরিবর্তন করে স্কুলে যেতে হয়। প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে আবেদন করেও প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বেড়া সরানোর চেষ্টা করলে তাঁর মেঝো ভাইয়ের পরিবারের লোকজন হামলা চালানোর চেষ্টা করেন এবং তাঁর ঘরের ভিটির মাটি কেটে নিয়ে যান।
অন্যদিকে, মৃত শাহজাহানের ছেলে মোজাহিদ ও মেয়ে সালমা বেগম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁদের বাবা মারা যাওয়ার পর চাচা-জেঠারা তাঁদের ওপর জুলুম করেছেন। তাঁদের ফুফুকে তাঁরা লালন-পালন করেছেন দাবি করে বলেন, দাদির মৃত্যুর পর ফুফুকে অন্য পক্ষ নিয়ে যায় এবং তাঁর প্রাপ্য সম্পত্তি তাঁদের বাদ দিয়ে দুই চাচার নামে লিখে নেওয়া হয়েছে।
তাঁদের দাবি, বড় চাচা তাঁদের দুই শতাংশ জায়গা দখল করে ঘর নির্মাণ করেছেন। ওই জায়গা উদ্ধারের জন্যই চাচার ঘরের ভিটির মাটি কাটা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ফুফুর সম্পত্তির হিস্যা পাওয়ার দাবিতে রাস্তা বন্ধ করা হয়েছে বলেও তাঁরা জানান।
এ বিষয়ে দেবীদ্বার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফয়সল উদ্দিন বলেন, অভিযোগটি তাঁর হাতে এখনো পৌঁছায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।