

ধাঁধার চরে ২৪০ একর খাসজমি চেয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, স্থানীয়দের ক্ষোভ
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মিলনস্থলে জেগে ওঠা ধাঁধার চরে ৪৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ধাঁধার চরসহ ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছে সাননোভা এনার্জি ওপিসি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা গত ১৬ আগস্ট গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে এ আবেদন করেন। আবেদনে অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর আওতায় বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জমি বন্দোবস্ত চাওয়া হয়েছে। আবেদন করা জমির মধ্যে ৩০ একরের বেশি নদী শ্রেণির জমি রয়েছে।

এই চর ৩০০ পরিবারের জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে জড়িত। এখানে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র হলে আমাদের জীবন-জীবিকা ও চরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগের উদ্যোগও রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে চরের কৃষি, গবাদিপশু পালন, জীবিকা, পর্যটন সম্ভাবনা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁদের দাবি, শত শত পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ চরের ওপর নির্ভরশীল।
ঘিঘাট গ্রামের বাসিন্দা জাহিদুল হক ভূঁইয়া বলেন, “এই চর আমাদের রুটি-রুজির জোগান দেয়। এখানে প্রায় ৩০০ পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। কৃষিকাজের পাশাপাশি এটি পর্যটন এলাকা এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। এই চর আমরা হাতছাড়া হতে দেব না।”
স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল হক আঙ্গুর বলেন, প্রতিদিন বহু মানুষ নৌকায় করে ধাঁধার চরে যায়। সেখানে কয়েক শ পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল। আম, জাম, পেয়ারা, বরইসহ বিভিন্ন ফল এবং ধান, গম, আখ ও বাদামসহ নানা ফসল উৎপাদন হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীবেষ্টিত ধাঁধার চরে কৃষিজমি, গাছপালা ও ঝোপঝাড় রয়েছে। কৃষকেরা নৌকায় করে চরে যাতায়াত করছেন এবং বিভিন্ন ফসলের পরিচর্যা করছেন। চরে গবাদিপশু পালনের জন্য গোয়ালঘরও রয়েছে। বিভিন্ন গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে পাখির বিচরণও দেখা যায়।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমির মধ্যে নদী, শিকস্তি ভূমি, নাল, বালুচরসহ বিভিন্ন শ্রেণির জমি রয়েছে। এর মধ্যে নদী শ্রেণির জমির পরিমাণ ৩০ দশমিক ৭০ একর।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, নদী ও নদীসংলগ্ন ভূমির ক্ষেত্রে জনস্বার্থ ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ ধরনের জমি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বন্দোবস্ত দেওয়ার আগে আইনগত ও পরিবেশগত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা উচিত।
এ বিষয়ে সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
কাপাসিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক বলেন, ধাঁধার চর মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমির শ্রেণি নদী, শিকস্তি ভূমি, নাল, ছনখোলা, বালুচর ও লায়েক পতিত। বন্দোবস্তের আবেদনের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। পরে তা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ধাঁধার চরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি বন্দোবস্ত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি যাচাই-বাছাই করতে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমি ইজারা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।