

কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে রাজধানীর চারটি বার ও রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শনিবার (৩ অক্টোবর) কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) চারটি দল এসব অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযান চালানো প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ফু-ওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, রে-ক্যানভাস রেস্টুরেন্ট, হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল ও মার্গারিটা লাউঞ্জ। অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের অবৈধ উৎস এবং শুল্ক-ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে এসব প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়।
এনবিআর সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর বিভিন্ন বার, রেস্টুরেন্ট, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও শুল্কমুক্ত দোকান থেকে অবৈধ উৎসে অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্য সংগ্রহের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানে প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুতে থাকা অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের উৎস, আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত দলিল, পণ্যের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট শুল্ক, মূসক ও আয়কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনিয়ম পাওয়া গেলে পণ্য আটক এবং এসব পণ্য অননুমোদিত গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর নিউ জুরাইনে আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ পাওয়া যায়। এসব মদ আমদানির বৈধ নথিপত্র দেখাতে না পারায় তা জব্দ করা হয়।
পরে আইরিশ পাবের কর্মকর্তারা দাবি করেন, মদগুলো বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন থেকে কেনা হয়েছিল। তবে এর পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ দেখাতে পারেননি বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট শুল্ক কর্মকর্তারা।
অভিযানে জব্দ করা মদের মধ্যে স্কটল্যান্ড ও লন্ডন থেকে আমদানি করা ইম্পেরিয়াল হুইস্কিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভদকা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কদমতলী থানায় ফৌজদারি মামলাও করা হয়।
শুল্ক কর্মকর্তাদের আরও অভিযোগ, পর্যটন করপোরেশন থেকে বিদেশি মদ কেনার ২০১৬ সালের নথি ব্যবহার করে পরবর্তী বছরের উৎপাদিত মদ বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। একই অভিযানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদনবিহীন ৫৭টি ওয়াকিটকিও উদ্ধার করা হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এক শুল্ক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আইরিশ পাবের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পর তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের চাপ ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেছিল। তার দাবি, আইরিশ পাবের বিদেশি মদ বিক্রির বিপরীতে বৈধ বিল অব এন্ট্রির নথি পাওয়া যায়নি।
শুল্ক কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আইরিশ পাব কর্তৃপক্ষ যে লাইসেন্সের মাধ্যমে পণ্য আমদানির দাবি করেছিল, সেটি মূলত কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির লাইসেন্স। ওই লাইসেন্স ব্যবহার করে বৈধভাবে মদ আমদানি করা সম্ভব নয় বলেও দাবি করেন তারা।
এ ছাড়া আইরিশ পাবের কাছে বিদেশি মদের বড় মজুত কীভাবে এলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি প্রতিবেদনে।
আইরিশ পাবের মালিকানা নিয়েও প্রতিবেদনে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, শেখ নূর ইসলামের পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার ছিল। পরবর্তী সময়ে এসব শেয়ার অন্যদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও শেখ নূর ইসলামই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মূলত সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রেস্টুরেন্টের সাধারণ লাইসেন্স নিয়ে বার পরিচালনা এবং বুড়িগঙ্গার তীরসংলগ্ন এলাকায় একটি গুদাম স্থাপনের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অভিযোগের বিষয়ে শেখ নূর ইসলাম বলেন, আইরিশ পাব অ্যান্ড বার তিনি অনেক আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স নিয়ে বার পরিচালনা এবং প্রভাব বিস্তার করে তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। বর্তমানে তিনি এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন বলেও জানান।
এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান বলেন, আইরিশ পাবে একটি অভিযান হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। ওই সময়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এনবিআর জানিয়েছে, চার প্রতিষ্ঠানে অভিযান শেষে যাচাই-বাছাই ও তদন্তের ভিত্তিতে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।