

ছেলেকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অসুস্থ হওয়ার দাবি পরিবারের, তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ
কুমিল্লার দেবীদ্বারে মারামারির একটি মামলা তদন্তে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে ছেলেকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় স্ট্রোক করেন এক মা। এরপর তিন দিন অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে মারা যান হাসনা বেগম (৫৬)। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল বলে জানিয়েছে পরিবার।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবার ও এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার বাদ আসর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
নিহত হাসনা বেগম দেবীদ্বার পৌর এলাকার ভূষণা গ্রামের নেহাল কাজীর বাড়ির আব্দুল আজিজের স্ত্রী।
মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২০ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাড়ির পাশের একটি গর্তের পানি সেচে আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শুভ মাছ ধরছিলেন। এ সময় একই এলাকার মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে ট্রাক্টরচালক নবী নেওয়াজ (৩৮) মাছগুলো ফেলে দিয়ে নিজেই মাছ ধরতে শুরু করেন। এ নিয়ে শুভ ও স্থানীয়দের সঙ্গে নবী নেওয়াজের বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে শুভর পক্ষের লোকজন নবী নেওয়াজকে মারধর করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই দিন বিকেলে নবী নেওয়াজ ছয়টি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন লোক নিয়ে শুভদের বাড়িতে হামলা চালান। এ সময় বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়।
হামলায় শুভর বাবা আক্তার হোসেন (৩৮) গুরুতর আহত হন। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লাগে এবং সামনের তিনটি দাঁত ভেঙে যায় বলে পরিবারের দাবি। পরে তাঁকে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর পায়ের একটি ক্ষতস্থানে ৩৮টি সেলাই দিতে হয়েছিল বলে জানিয়েছে পরিবার।
ঘটনার পর গ্রামবাসী ধাওয়া করে ধামতী গ্রামের আব্দুল কাদের নামে একজনকে আটক করেন। পরে দেবীদ্বার থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
মামলা ও পাল্টা অভিযোগ
এ ঘটনায় ২১ সেপ্টেম্বর আহত আক্তার হোসেনের ছোট ভাই আল আমিন বাদী হয়ে নবী নেওয়াজ, হামলার নেতৃত্বে থাকার অভিযোগে আব্দুল কাদেরসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা অন্যদের আসামি করে দেবীদ্বার থানায় মামলা করেন।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর আসামিপক্ষের লোকজন তাঁদের বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে নবী নেওয়াজকে মারধরের অভিযোগেও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে থানায় আরেকটি অভিযোগ দেওয়া হয়। দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে নবী নেওয়াজের বড় ভাই দুলালের উদ্যোগে সামাজিক সালিশ অনুষ্ঠিত হয়।
তদন্ত কর্মকর্তাকে দেখে অসুস্থ হওয়ার অভিযোগ
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) অজয় চক্রবর্তী তদন্তের কাজে ভূষণা গ্রামে যান। অভিযুক্তের বাড়িতে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর তিনি বাদীপক্ষের বাড়ির দিকে এলে আল আমিনের মা হাসনা বেগম আশঙ্কা করেন, তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ এসেছে। এ সময় ছেলেদের সরে যেতে বলে চিৎকার করার পর তিনি স্ট্রোক করে অচেতন হয়ে পড়েন বলে পরিবারের দাবি।
আল আমিন জানান, মাকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে না পেরে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাতে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর শুক্রবার দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।
আল আমিনের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর ভাইয়ের আঘাতের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে মামলা আপস-মীমাংসার পরামর্শ দেন। তাঁর দাবি, ভাইয়ের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত, পায়ে ৩৮টি সেলাই এবং তিনটি দাঁত ভেঙে যাওয়ার বিষয় যথাযথভাবে মামলায় উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে মামলার এক নম্বর আসামি আদালতে হাজির হওয়ার পর জামিন পেয়েছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
যা বলছেন তদন্ত কর্মকর্তা
অভিযোগের বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অজয় চক্রবর্তী বলেন, “অভিযোগ লিখেছেন বাদী। ওসির নির্দেশে আমি মামলাটি তদন্ত করছি। দাঁত ভাঙা কিংবা কাটা-ছেঁড়ার বিষয় তদন্তে প্রমাণিত হলে চার্জশিটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, বাদীকে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতে হয়—এ কথা বিবেচনায় নিয়ে তিনি আপস-মীমাংসার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তদন্তের আশ্বাস পুলিশের
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ধারালো অস্ত্রের আঘাত কিংবা দাঁত ভেঙে যাওয়ার ঘটনা থাকলে তা মামলায় উল্লেখ থাকার কথা। বিষয়টি এমন হওয়ার কথা নয়। পুলিশকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে বাদীর মায়ের স্ট্রোক এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
হাসনা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার যে অভিযোগ তুলেছে, তা তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায় থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।