

হোটেলের রেজিস্টারে নাম ‘তানজু আক্তার’, বয়স ১৮; কুমিল্লায় ফেরার পথে সিএনজিচালকের হাতে হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী
কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের কক্সবাজারে অবস্থানের বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। হোটেলের রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয়েছিল ‘তানজু আক্তার’, বয়স উল্লেখ করা হয়েছিল ১৮ বছর। সেখানে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর স্ত্রী হিসেবে তার পরিচয় দেওয়া হয়। হোটেলের নথি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে কক্সবাজারের কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠে তাজমিন ও রিয়াজ। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছাড়ে। পরে রিয়াজ তাজমিনকে কুমিল্লাগামী ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসে তুলে দেন বলে তাঁর এক সহকর্মী জানিয়েছেন। বাসের টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা।
হোটেলের রেজিস্টারে রিয়াজের পরিচয় হিসেবে বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলের তথ্য লেখা ছিল। সেখানে তাঁর দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরও নথিভুক্ত করা হয়। হোটেলের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত অবস্থানের পর তাঁরা হোটেল ছেড়ে চলে যান।
রিয়াজের এক সহকর্মীর দাবি, ফেসবুকের মাধ্যমে প্রায় ১৭ দিন আগে তাজমিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তবে রিয়াজের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, তাঁদের পরিচয় হয়েছিল প্রায় পাঁচ মাস আগে। এরপর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাঁদের মধ্যে।
ওই সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর রিয়াজ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তাঁর কাছে সহায়তা চান। ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। ঘটনার পর থেকে রিয়াজের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান ওই সহকর্মী।
তাজমিনের বাড়ি ছাড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও কিছু তথ্য সামনে এসেছে। গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার মনোমালিন্য হয়। এরপর সে বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায়। সেখান থেকে রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিকাশের মাধ্যমে তাকে ৫০০ টাকা পাঠান এবং কক্সবাজারে আসতে বলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে বাসে ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রিয়াজের মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল বলে তাঁর সহকর্মী জানিয়েছেন। ওই সময় তাজমিন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সম্পর্কে রিয়াজকে তথ্য দিয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
সহকর্মীর ভাষ্য, রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে রিয়াজ স্তম্ভিত হয়ে পড়েন বলে তিনি জানান। রিয়াজ গত তিন বছর ধরে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন বলেও ওই সহকর্মী দাবি করেন।
গত ৭ অক্টোবর বাড়ি ফেরার পথে তাজমিন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমন মিয়ার হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় বলে মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। পরদিন সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরালজগপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে (৩৫) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মুঠোফোনের কললিস্টসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আসামি হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে।