

মুরাদনগরে বিধবা নাজমার আকুতি, ‘মরার আগে মেয়েটার মাথা গোঁজার ঠাঁই দেখে যেতে চাই’—অসহায় মেয়েকে নিয়ে কাঁদছেন অসুস্থ মা
বাবা নেই, স্বামী নেই, নিজের নামে নেই এক টুকরো জমি, নেই মাথা গোঁজার মতো একটি ঘর। অথচ বেঁচে থাকার দায় আছে, আছে ১৭ বছর বয়সী দুই যমজ সন্তানকে মানুষ করার কঠিন দায়িত্ব। অভাবের সংসারে এক মুঠো খাবার জোগাড় করতে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন নাজমা আক্তার, যিনি এলাকায় নাসু নামেই পরিচিত। দিন শেষে যা পান, তা দিয়েই চলে তাঁর সংসার। কিন্তু সেই সংসারে নেই নিজের কোনো ঘর, নেই নিশ্চিন্তে মাথা রেখে ঘুমানোর স্থায়ী জায়গা। বাবার বাড়িতে ভাইদের রান্নাঘরের এক কোণে কোনোমতে রাত কাটে তাঁর। এভাবেই বছরের পর বছর বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯ নম্বর দারোরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাজিয়াতল গ্রামের চাঁনগাজী মুন্সী বাড়ির এই অসহায় নারী।
নাজমার জীবনের গল্প কেবল একজন বিধবা নারীর দুঃখের গল্প নয়; এটি দুই সন্তানকে বুকে আগলে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা, দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই এবং একটু আশ্রয় ও কাজের বিনিময়ে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার আকুতির গল্প। তাঁর প্রত্যাশা, সরকার ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষেরা পাশে দাঁড়ালে হয়তো তাঁর সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চিত জীবনের অবসান ঘটবে।
নাজমা আক্তারের বাবা মৃত জয়নাল আবেদীন, মা মনোয়ারা বেগম এবং স্বামী মৃত আনোয়ার হোসেন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে নাজমা সবার বড়। জন্ম থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাবার বাড়িতেই তাঁর বসবাস। বিয়ের পর কখনো স্বামীর বাড়িতে যাওয়া হয়নি তাঁর। স্বামীর বাড়ি কোথায়, সেই ঠিকানাও তাঁর জানা নেই। শুধু স্বামী জীবিত থাকাকালে তাঁর মুখে শুনেছিলেন, তাঁদের বাড়ি দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁওয়ে। ২০১৪ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে তাঁর জীবনে নেমে আসে আরও কঠিন বাস্তবতা।
নাজমার যমজ দুই সন্তানের একজন ছেলে শাহিন আলম, অন্যজন মেয়ে সুলতানা আক্তার মীম। দুজনেরই বয়স ১৭ বছর। অভাবের সংসারেও ছেলেকে পবিত্র কোরআনের হাফেজ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি। শাহিন কোরআন হিফজ শেষ করে বর্তমানে শুনানি পড়ছে। কিন্তু মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পারায় সুলতানা আক্তার মীমের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। মায়ের অসহায়ত্ব আর সংসারের টানাপোড়েনে একটি মেয়ের শিক্ষাজীবন থমকে আছে—যে বয়সে তার বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে থাকার কথা, সে বয়সে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে।
নাজমার ডান চোখেও কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তবে তিনি শারীরিকভাবে কর্মক্ষম। গৃহকর্মসহ বিভিন্ন ধরনের পরিশ্রমের কাজ করতে পারেন। মানুষের বাড়িতে কাজ করে উপার্জিত সামান্য অর্থ দিয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই উপার্জনে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোই কঠিন; নিজের জন্য একটি ঘর তৈরি করা কিংবা মেয়ের পড়াশোনা আবার শুরু করার সামর্থ্য তাঁর নেই।
বাবার বাড়িতে থাকলেও নাজমার নিজের কোনো ঘরবাড়ি বা জমিজমা নেই। ভাইয়েরাও অভাবের সংসারে দিন এনে দিন খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজেদের পরিবারের ব্যয় মেটাতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়। ফলে নাজমার জন্য আলাদা একটি ঘর তৈরি করে দেওয়া তাঁদের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। গ্রামবাসী ও বাড়ির লোকজনের সহায়তায় ভাইদের রান্নাঘরের এক কোণে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটছে তাঁর। বাস্তুভিটাহীন, ভূমিহীন এই নারীর কাছে একটি ছোট ঘর শুধু ইট-টিনের স্থাপনা নয়; সেটি তাঁর সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
নাজমা আক্তার বলেন, “আমার বাবা নেই, স্বামীও নেই। এই দুই সন্তানকে নিয়ে এখন কোথায় যাব? সন্তানদের ফেলে নতুন করে সংসার পাতাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি বাবার বাড়ির রান্নাঘরের এক কোণে থাকি। আমার ভাইয়েরাও দিন আনে দিন খায়। তাদের নিজেদের সংসার চালাতেই অনেক কষ্ট হয়। তারা আমাকে আলাদা করে ঘর করে দেবে, সেই সামর্থ্য তাদের নেই। আমারও বাড়িঘর করার মতো কোনো সামর্থ্য নেই।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে নাজমা আরও বলেন, “আমি কারও কাছে বিলাসী জীবন চাই না। শুধু চাই, আমার সন্তানদের নিয়ে মাথা গোঁজার মতো একটু জায়গা। সরকার বা কেউ যদি আমাকে এক টুকরো জমি দিতেন, সেখানে ছোট্ট একটি ঘর করে দিলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারতাম। আমি শারীরিকভাবে কাজ করতে পারি। আমাকে যদি একটি কাজের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে নিজের পরিশ্রমে সংসার চালাতে পারব। সবার কাছে আমার আবেদন, আমার দিকে একটু সহানুভূতির চোখে তাকান। আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আমাকে বাঁচার একটি সুযোগ দিন।”
নাজমার এই অসহায় জীবনের মধ্যেই সামনে এসেছে কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে ‘পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান (RRMEP)’ শীর্ষক প্রকল্পে দারোরা ইউনিয়ন থেকে নারী কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রকল্পটি জুলাই ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। প্রতি ইউনিয়ন থেকে ১০ জন নারী কর্মী এবং অপেক্ষমাণ তালিকার জন্য আরও পাঁচজন নারী বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও পরিবারপ্রধান হতদরিদ্র নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাঁরা কায়িক শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রার্থীদের শারীরিকভাবে মাটির কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে এবং বয়স হতে হবে ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দা হওয়া বাধ্যতামূলক। নির্বাচিত কর্মীর বাড়ি সংশ্লিষ্ট নির্বাচিত সড়কের দুই কিলোমিটারের মধ্যে হতে হবে। এলজিইডির মেরামতের তালিকাভুক্ত সড়কের কাছাকাছি বসবাসকারী নারীরা অগ্রাধিকার পাবেন। এ ছাড়া আগের তিন পর্যায়ের পল্লী কর্মসংস্থান ও সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ (RERMP) প্রকল্পে কর্মরত নারীরা নতুন প্রকল্পে নিয়োগের যোগ্য হবেন না।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত তারিখ, সময় ও স্থানে প্রার্থীদের নাগরিকত্ব সনদ, মূল জাতীয় পরিচয়পত্র, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে সশরীরে উপস্থিত হতে হবে।
নাজমার দাবি, তাঁর বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, আর্থিক অসচ্ছলতা, স্থানীয় বাসিন্দা হওয়া এবং কায়িক শ্রমে কাজ করার সক্ষমতা বিবেচনায় তিনি এ পদে নিয়োগের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। তিনি দারোরা ইউনিয়নের নারী কর্মী হিসেবে নিয়োগ পেতে চান। এই কাজের সুযোগ পেলে নিজের শ্রমে উপার্জনের মাধ্যমে সন্তানদের ভরণপোষণ চালানোর পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনা আবার শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তবে নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই ও নির্ধারিত শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল।
এ অবস্থায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ধর্মমন্ত্রী আলহাজ্ব কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, তাঁর মামা সৈয়দ এ.কে.এম. কায়েস আহমেদ মীর এবং বিশেষ করে মুরাদনগর উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সাল বারী পূর্ণের সহযোগিতা কামনা করেছেন নাজমা। তাঁর প্রত্যাশা, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে তাঁকে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে সহযোগিতা করা হবে, যাতে তিনি অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর না করে নিজের পরিশ্রমে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।
নাজমার অসহায়ত্বের আরেকটি হৃদয়বিদারক দিক তাঁর অসুস্থ মা মনোয়ারা বেগমের আকুতি। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এই মা জানেন না, তাঁর জীবনের অবশিষ্ট সময় কতটুকু। মৃত্যুর আগে মেয়েকে একটি নিরাপদ আশ্রয়ে দেখে যেতে চান তিনি।
মনোয়ারা বেগম বলেন, “আমি অসুস্থ। কখন মারা যাই, তা ঠিক নেই। আমার মৃত্যুর আগে যদি দেখে যেতে পারতাম, আমার বিধবা মেয়েটি তার সন্তানদের নিয়ে থাকার মতো একটা জায়গা পেয়েছে, তাহলে মরেও শান্তি পেতাম।”
একজন মায়ের এই আকুতির মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য অসহায় পরিবারের বাস্তবতা। মেয়ের জন্য বড় কোনো সম্পদ নয়, কেবল একটু নিরাপদ আশ্রয়—এটুকুই তাঁর চাওয়া। যে মেয়েকে তিনি জন্ম দিয়েছেন, সেই মেয়েকে নিজের চোখের সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা তাঁর জন্য অসহনীয়।
নাজমার এই মানবিক পরিস্থিতিতে দৈনিক আজকের কথা পত্রিকার সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি বিশেষভাবে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাসান খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, নাজমার মতো বাস্তুভিটাহীন ও অসহায় নারীর বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “নাজমা যাতে এলজিইডির নারী কর্মী নিয়োগে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ন্যায্যভাবে বিবেচিত হন এবং কোনোভাবেই অযৌক্তিকভাবে বাদ না পড়েন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পাশাপাশি তিনি প্রকৃত ভূমিহীন ও সরকারি খাসজমি বরাদ্দের নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য হলে তাঁর জন্য খাসজমি বরাদ্দের বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। সেখানে একটি ছোট ঘর নির্মাণের সুযোগ পেলে তিনি সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন।”
তিনি আরও বলেন, ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনে সরকারের যেসব কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলোর আওতায় নাজমার যোগ্যতা যাচাই করে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা ভূমি কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বিত সহযোগিতা তাঁর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
নাজমার জন্য কর্মসংস্থান ও আবাসনের ব্যবস্থা করা হলে তা শুধু একজন অসহায় নারীর পাশে দাঁড়ানো হবে না; বরং তাঁর দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার পথও খুলে যেতে পারে। একটি কাজ তাঁর হাতে তুলে দিতে পারে আত্মনির্ভরতার শক্তি, আর একটি ঘর ফিরিয়ে দিতে পারে নিরাপত্তা ও মর্যাদার অনুভূতি। মেয়ের বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা আবার শুরু করার স্বপ্নও তখন নতুন করে ডানা মেলতে পারে।
এখন নাজমার আকুতি সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, এলজিইডি কর্তৃপক্ষ এবং সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি। তিনি করুণা নয়, চান কাজ করার সুযোগ; চান না কারও বোঝা হয়ে থাকতে, চান নিজের পরিশ্রমে সন্তানদের নিয়ে বাঁচতে। তাঁর এই চাওয়াটুকু পূরণ হলে হয়তো একদিন রান্নাঘরের এক কোণে রাত কাটানো নাজমার জীবনেও ফিরবে স্বস্তির আলো, আর অসুস্থ মা মনোয়ারা বেগমের বুকেও জমবে একটু প্রশান্তি।