

১৫ বছরেও অধরা হত্যার রহস্য, জীবনের শেষ প্রান্তে ছেলে-পুত্রবধূর হত্যার বিচার চান সালেহা মনির
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি মামলার তদন্ত। আদালত ১৩১ বার সময় নির্ধারণ করলেও এখনো জমা পড়েনি তদন্ত প্রতিবেদন। আগামী ৫ নভেম্বর ১৩২তম বারের মতো প্রতিবেদন জমার দিন ধার্য রয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষা আর হতাশার মধ্যে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সাগরের মা সালেহা মনিরের এখন একটাই আকুতি—জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অন্তত ছেলে ও পুত্রবধূ হত্যার বিচার দেখে যেতে চান তিনি।
ছেলে ও পুত্রবধূকে হারানোর স্মৃতি মনে পড়তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ৭৪ বছর বয়সী সালেহা মনির। এত বছরেও কেন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হলো না, সেই প্রশ্ন তাঁর।
সালেহা মনির বলেন, “কোন মা তাঁর সন্তানের হত্যার বিচার চাইবেন না? ঘটনাটা তো একেবারেই স্পষ্ট ছিল। এত বছর পেরিয়ে গেল, অথচ কেউ কিছু বের করতে পারল না।”
ফোনে কথা বলার একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি বেঁচে থাকতে যেন বিচার দেখে যেতে পারি, এটাই আমার আশা।”
সালেহা মনির জানান, গণমাধ্যমে তিনি দেখেছেন, তদন্ত শেষ করতে টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে টাস্কফোর্সের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এর আগে পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
মামলার তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন মেহেরুন রুনির ভাই ও মামলার বাদী নওশের আলম রোমান। তাঁর অভিযোগ, তদন্তের নামে বারবার সময় বাড়ানোর আবেদন মামলাটিকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
রোমান বলেন, “টাস্কফোর্সের বারবার ছয় মাস করে সময় বাড়ানোর আবেদন আসলে তদন্ত বিলম্বিত করার কৌশল ছাড়া কিছু নয়। এতে প্রমাণ হয়, তদন্তে তারা কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি।”
তবে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি। ওই সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এবং টাস্কফোর্সের প্রধানকে তলব করা হয়েছে। রোমানের মতে, তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকা জরুরি। প্রসিকিউটরের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কতটা এগিয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
১৫ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
সাগর সরওয়ার ছিলেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক। তাঁর স্ত্রী মেহেরুন রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় তাঁদের হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় ছিল তাঁদের একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ। তখন তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর।
এ ঘটনায় এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, পলাশ রুদ্র পাল, আনামুল হক ওরফে হুমায়ুন কবির এবং তানভীর রহমান খান। তাঁদের মধ্যে তানভীর ও মিন্টু বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। পলাশ পলাতক। অন্য আসামিরা কারাগারে আছেন।
এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম আরিফুল ইসলাম তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ৫ নভেম্বর দিন ধার্য করেন।
তিন দফায় বদলেছে তদন্ত সংস্থা
২০১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা হওয়ার পর প্রথমে ওই থানার পুলিশ তদন্তের দায়িত্ব পায়। তিন দিন পর, ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটি পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ডিবি তদন্ত চালায়।
এরপর ২০১২ সালের এপ্রিলে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব)। ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটি মামলাটির তদন্ত করে। বর্তমানে বাহিনীটির নাম স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
হাইকোর্টের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর মামলাটি তদন্তে চার সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধানকে এর আহ্বায়ক করা হয়। একই বছরের ৪ নভেম্বর পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
নতুন তদন্তে কতটা অগ্রগতি
গত ১৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে ২৭ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেয় টাস্কফোর্স।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও তদন্ত কর্মকর্তা আজিজুল হক স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের তদন্তকারীরা ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছিলেন। টাস্কফোর্স দায়িত্ব নেওয়ার পর আরও ৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৪ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান এবং একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলার ডিজিটাল আলামত ও তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব আলামত ও তথ্য তদন্তের স্বার্থে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় পর্যন্ত সেসব তথ্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ সময়ে তদন্ত সংস্থার পরিবর্তন, বারবার সময় বৃদ্ধি এবং নতুন করে আলামত সংগ্রহের উদ্যোগ—কোনোটিই এখনো মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি। ফলে সাগর-রুনি হত্যার বিচার কবে শুরু হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
একদিকে দুই পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, অন্যদিকে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সালেহা মনিরের শেষ আকুতি—ছেলে ও পুত্রবধূ হত্যার বিচার দেখে যেতে চান তিনি। ১৫ বছরেও তাঁর সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।