

১০ বছর ধরে চলা বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পে ব্যয় ৮০ কোটি টাকা, অধিকাংশ প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত; প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ ও সমৃদ্ধ করতে ১০ বছর ধরে কাজ করছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এ সময়ের মধ্যে ১২টি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এসব প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১৫৮ কোটি টাকা। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় মোট ১৬টি সফটওয়্যার, প্রযুক্তি উপকরণ ও সেবা তৈরির পরিকল্পনা ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে সব সেবা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত কিংবা সহজলভ্য হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে বাংলা ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে ছবি বা নথি থেকে লেখা শনাক্ত ও রূপান্তরের ওসিআর, অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান যাচাই, ব্যাকরণ সংশোধন, ভাষা অনুবাদ, বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ড, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল কনভার্টার এবং ইশারাভাষা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দিতে তৈরি করা হয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট।
প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেবাভেদে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য তৈরি ‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবটে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অনুরোধ আসে। বাংলা ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে মাত্র ২৭৫টি। অন্যদিকে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসে। কাগজডটএআই প্ল্যাটফর্মের ওসিআর সেবায় দৈনিক অনুরোধের সংখ্যা প্রায় ৫০টি।
প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করে দেখা গেছে, বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটি তুলনামূলক ভালো ফল দিচ্ছে। তবে বড় আকারের অডিও ফাইল থেকে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) সক্ষমতা রয়েছে, তা দিয়ে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান অবকাঠামোয় একসঙ্গে পাঁচ থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারী সেবা নিতে পারলেও চাহিদা বাড়লে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বৃহৎ পরিসরে সেবা চালু রাখতে অতিরিক্ত জিপিইউ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন।
প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও তথ্য সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অফিস ব্যবস্থাপনা, সভা-সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা ও পরিচালন কার্যক্রমে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, তৈরি করা প্রযুক্তিগুলোর কোনটিতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে কাজের মানের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় শুধু সফটওয়্যার তৈরি নয়, বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার তৈরির কাজও করা হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আট হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টা এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও এবং ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আগের সরকারের সময় নেওয়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাদ দেওয়া এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হলেও এর ব্যয় কমানো হয়নি।
আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু প্রযুক্তি তৈরি হলেও সব কটির কার্যকারিতা সমান নয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাছে সেবাগুলো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এসব প্রযুক্তিকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে এনে আরও ব্যবহারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেসব কার্যক্রম অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইসিটি খাতে ২১টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রকল্পগুলো পর্যালোচনায় ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বেশ কিছু প্রকল্পে উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম এবং আইসিটি বিভাগের আওতাবহির্ভূত কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দিলে প্রায় ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইসিটি খাতের প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, অতীতের প্রকল্পগুলোর কর্মপদ্ধতি ও ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়ানো হলে পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে ১০ বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তিগুলোর বাস্তব উপযোগিতা, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এসব প্রযুক্তি সচল রাখা এবং জনগণের ব্যবহার উপযোগী করার দায়িত্ব কে নেবে, সেটিও এখন বড় বিবেচ্য বিষয়।