কুমিল্লার আইসিইউ সংকট এখন চরমে। দুইটি বড় সরকারি হাসপাতালের ৬০টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ৪৮টি অচল হয়ে পড়ে আছে। কোটি টাকার সরঞ্জাম ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র জনবল ও প্রকল্পের অভাবে। করোনা বা অন্য যে কোনো জরুরি অবস্থায় এই পরিস্থিতি ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে জেলার সাধারণ মানুষকে।
করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সতর্কতা বাড়লেও কুমিল্লায় নেই কোনো প্রস্তুতি। করোনা পরীক্ষার কিট নেই, বন্ধ রয়েছে টিকাদান কর্মসূচিও। এরমধ্যেই ইমারজেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় অচল হয়ে পড়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিটগুলো।
২০২০ সালের জুন মাসে ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় কুমিল্লার দুই হাসপাতালে দুটি বিশেষ আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এসব ইউনিটে আর্থিক ও জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের ৩০টি আইসিইউ বেডের মধ্যে মাত্র দুইটিতে চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। বাকি ২৮টি বেড অচল হয়ে পড়ে আছে। একই অবস্থা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও, যেখানে ৩০টির মধ্যে মাত্র ১০টি বেড সচল আছে।

চিকিৎসক ও নার্সদের দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না মেলায় চিকিৎসা কার্যক্রমে স্থবিরতা এসেছে। গত কয়েক মাস ধরে এই বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন শুধুমাত্র দায়িত্ববোধ থেকে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইজিও বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট মাইন উদ্দিন মিয়াজী বলেন, “সরকারি সিদ্ধান্ত না এলে এই সেবা চালু রাখা সম্ভব নয়। আমরা চাই, প্রকল্পের মেয়াদ আবারো বাড়িয়ে জনবল ফিরিয়ে আনা হোক।”
জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবদুল মুকতাদির জানান, “মাত্র একজন চিকিৎসক ও চারজন নার্স দিয়ে একটি ইউনিট চালানো হচ্ছে, যা প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার জন্য খুবই অপ্রতুল।” তিনি জানান, “করোনার সময় আমরা যেভাবে জীবন বাজি রেখে কাজ করেছি, সেটা যেন অন্তত স্বীকৃতি পায়।”
করোনার সময় কুমিল্লায় প্রায় সাড়ে চার হাজার রোগী আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে এক হাজার ৮০০ জন প্রাণ হারান। কিন্তু এখন যখন রোগীর সংখ্যা কমলেও আইসিইউ সেবার প্রয়োজনীয়তা কমেনি, তখন এই অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ বেডে প্রতিদিনের খরচ মাত্র সাড়ে ৬০০ টাকা, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এর জন্য ৪০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। সেজন্য সরকার ও কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ থাকবে, এই ইউনিটগুলো নষ্ট না করে জনগণের সেবায় ব্যবহার করা হোক।”
কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর বশির জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। আইসিইউ ইউনিট সচল করতে অন্তত ১৫ জন জনবল প্রয়োজন বলে জানান তিনি। করোনা পরীক্ষার কিটের জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং নতুন করে গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের জন্য টিকা সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জনবল সংকট ও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কুমিল্লার আইসিইউ সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, দায়িত্ববোধ থেকে সীমিত ক্ষমতায় সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর পদক্ষেপ নিলে দ্রুত এই জরুরি ইউনিটগুলো পুনরায় সচল করা সম্ভব। সচেতন মহল মনে করেন, কোটি টাকার স্থাপনা নষ্ট না করে জনসেবায় ব্যবহার করাই এখন সময়ের দাবি।

আজকের কথা ডেস্ক