প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

স্বপ্ন দেখে বাস্তব করেছেন স্বপ্নীল: নারীদের স্কুটি প্রশিক্ষণের অগ্রদূত কুমিল্লায়

1742123807275
রোমানা আক্তার

নারীদের স্কুটি প্রশিক্ষণ ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন কুমিল্লার মুরাদনগরের স্বপ্নীল সুলতানা। একসময় যেখানে নারীদের বাইক চালানো ছিল কল্পনার বিষয়, আজ সেখানে নারীদের স্বপ্নপূরণের নেপথ্যে তিনি নিজেই একটি নাম।

স্বপ্নীল কুমিল্লা শহরের প্রথম নারী যিনি নিজ উদ্যোগে স্কুটি ও মোটরসাইকেল চালানো শেখাতে শুরু করেন। ২০১৮ সালে মাত্র ৩ জন নারীকে দিয়ে যাত্রা শুরু হয় তাঁর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। আজ সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে আড়াই হাজারেরও বেশি। তিনি নিজেই গড়ে তুলেছেন একটি স্কুটি প্রশিক্ষণ সেন্টার, যেখানে আরও পাঁচজন নারী প্রশিক্ষক কাজ করছেন।

নারীদের স্কুটি প্রশিক্ষণ
নারীদের স্কুটি প্রশিক্ষণ ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন কুমিল্লার মুরাদনগরের স্বপ্নীল সুলতানা। একসময় যেখানে নারীদের বাইক চালানো ছিল কল্পনার বিষয়। ছবি- সংগৃহিত।

এই পথচলার শুরুটা সহজ ছিল না। ২০১১ সালে বিয়ের পর স্বামীর উৎসাহে স্বপ্নীল চালিয়ে যান পড়াশোনা। ২০১৭ সালে নিজের জমানো টাকায় ও কিস্তিতে একটি স্কুটি কিনে শুরু করেন নতুন যাত্রা। তখন স্কুলে যাওয়ার পথে মানুষ কটুকথা বলত, আড়চোখে তাকাত, তবু থেমে যাননি তিনি। বরং উৎসাহিত হন যখন নারীরা জানতে চাইত—স্কুটি চালানো শিখেছেন কোথায়?

বর্তমানে মাসে প্রায় ৩০ জন নারী তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। শুধু কুমিল্লা নয়, আশপাশের জেলা থেকেও নারীরা আসছেন আত্মনির্ভরতার পাঠ নিতে। জনপ্রতি প্রশিক্ষণ ফি ৩ হাজার টাকা।

প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীদের মধ্যে কেউ এখন নিজেই অন্যদের শেখাচ্ছেন, কেউ বাচ্চাকে স্কুলে আনানেওয়া করছেন, কেউবা অফিসে যাচ্ছেন স্কুটিতে চড়ে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফারিহা ইসলাম বলেন, “আমি স্কুটি চালানো শিখে এখন বাচ্চাকে স্কুলে আনা-নেওয়া থেকে সব কাজ করি। এতে জীবনযাত্রা অনেক সহজ ও নিরাপদ হয়েছে।”
আরেকজন প্রশিক্ষক সুমাইয়া সুলতানা জানান, “স্বপ্নীল আপুর কাছ থেকে শেখার পর আমিও এখন অন্য নারীদের শেখাচ্ছি। ভালো আয় হচ্ছে, গর্বও হচ্ছে।”

নারীদের স্কুটি প্রশিক্ষণ শুধু শহরে নয়, এখন গ্রামবাংলাতেও নারীদের স্বাধীন ও সম্মানজনক চলাফেরার প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্বপ্নীলের একার যাত্রা বদলে দিয়েছে শত শত নারীর জীবন। এখন প্রশ্ন—এই নারী উদ্যোগে কি সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন কোনো সহায়তা দেবে? নারীদের স্কুটি প্রশিক্ষণ শুধু শহরে নয়, এখন গ্রামবাংলাতেও নারীদের স্বাধীন ও সম্মানজনক চলাফেরার প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্বপ্নীলের একার যাত্রা বদলে দিয়েছে শত শত নারীর জীবন। এখন প্রশ্ন—এই নারী উদ্যোগে কি সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন কোনো সহায়তা দেবে?
সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পেলে এই উদ্যোগ পৌঁছাতে পারে আরও বেশি নারীর কাছে, যারা এখনও নানা সামাজিক বাধা ও ভয়ের কারণে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। স্বপ্নীলের সাফল্য প্রমাণ করে—সঠিক দিকনির্দেশনা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে নারীরাও হতে পারেন বদলে দেওয়া শক্তি। এই প্রচেষ্টার পেছনে রয়েছে আত্মত্যাগ, সাহস এবং নারীর ক্ষমতায়নের এক অনন্য উদাহরণ। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহ দেয়, তবে প্রতিটি জেলায় হতে পারে একটি করে ‘স্বপ্নীল’—যাঁরা গড়ে তুলবেন আরও আত্মনির্ভর নারী প্রজন্ম।

প্রিন্ট করুন