প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার, ৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাঁশ-বেত শিল্পের শেষ প্রহরীর নাম রাধা চন্দ্র: কুমিল্লায় টিকে আছে শুধু ঐতিহ্যের মায়া

বাঁশ-বেত শিল্প
মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

বাঁশ-বেত শিল্প এক সময় ছিল বাংলার গর্ব, আজ তা যেন নিঃশেষ হওয়ার পথে। প্লাস্টিকের দাপটে টিকে থাকা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে এই ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের। তবে এই দুর্দিনেও কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার রাধা চন্দ্র নম পৈতৃক পেশা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। একদিকে কাঁচামালের সংকট, অন্যদিকে বাজারে প্লাস্টিক সামগ্রীর ছড়াছড়ি—সবকিছুকে উপেক্ষা করে তিনি এখনো মাটি ও মায়ার টানে তৈরি করছেন বাঁশ-বেতের জিনিসপত্র।

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি গ্রামে রাধা চন্দ্র নম এখন যেন বাঁশ-বেত শিল্পের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বয়স ৫৫ পেরিয়েছে, তবুও তার হাতে এখনো বুনে চলে ঐতিহ্য, ইতিহাস আর অস্তিত্ব। বাড়ির আঙিনায় স্ত্রী মঞ্জু রানীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তৈরি করছেন ডালা, কুলা, ঝুড়ি, মাছ ধরার ফাঁদ, ও বিভিন্ন গৃহস্থালির সামগ্রী।

রাধা জানান, “বাবার হাত ধরে শিখেছি, তিনি আবার শিখেছেন তার বাবার কাছে। এইভাবে চলেছে আমাদের বংশধরদের হাতে হাতে। এখন আয় দিয়ে সংসার চলে না, তবুও ছাড়তে পারছি না। এই কাজে মায়া লেগে গেছে।”

বাঁশ-বেত শিল্প
বাঁশ-বেত শিল্প এক সময় ছিল বাংলার গর্ব, আজ তা যেন নিঃশেষ হওয়ার পথে। ছবি : দৈনিক আজকের কথা

তিনি বলেন, “ছোটবেলায় এই জিনিসের খুব কদর ছিল। হাটে নিয়ে গেলে মুহূর্তেই সব বিক্রি হয়ে যেত। এখন তো কেউ তাকায়ও না। আমাদের সন্তানেরাও বলে—এতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।”

পাশাপাশি কাঁচামাল সংগ্রহের সমস্যাও বড় চ্যালেঞ্জ। আগে গ্রামের আশপাশেই বাঁশ পাওয়া যেত, এখন সেসব জায়গা দখল করেছে পাকা দালান। ফলে বাঁশ কিনতে হচ্ছে দূর এলাকা থেকে, যা বাড়িয়েছে খরচ। আর বাজারে প্লাস্টিকের জিনিস এত সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে গেছে যে বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য কেউ কিনতেই চায় না।

বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্যের টেকসইতা ও পরিবেশবান্ধব দিক তুলে ধরেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মাসুদ রানা। তিনি বলেন, “প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, কিন্তু বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব এবং শতভাগ জীবাণুমুক্ত। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “বাঁশের আবাদ কমে যাওয়া, আবাসন সম্প্রসারণ এবং সচেতনতার অভাব—এসব কারণে গ্রামীণ কুটির শিল্পগুলো বিলুপ্তির পথে। আমাদের উচিত নতুন প্রজন্মকে আবারও এই শিল্পে আগ্রহী করে তোলা।”

বাঁশ-বেত শিল্প আজ সংকটে নিপতিত হলেও, রাধা চন্দ্রের মতো কিছু মানুষের হাতে তা এখনো জীবন্ত। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সরকার ও সমাজ যদি এই শিল্পকে রক্ষা করতে এগিয়ে না আসে, তাহলে একদিন হয়তো রাধাদের অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়। তাই এখনই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও বাজার সৃষ্টি—যাতে এই প্রাচীন শিল্পটি আবার ফিরে পায় তার হারানো গৌরব।

প্রিন্ট করুন