হাঁকডাকহীন স্মৃতি—এই শব্দবন্ধেই লুকিয়ে আছে কুমিল্লার মুরাদনগরের এককালের জমজমাট সিদ্ধিগঞ্জ বাজারের করুণ বাস্তবতা। একসময় বুড়ি নদীর তীরে বসত নদীপথনির্ভর এই প্রাণবন্ত বাজার। চারপাশ মুখর থাকত ক্রেতা-বিক্রেতার গলা ফাটানো ডাকে, ভিড় করত নৌকা, ভেসে আসত বাঁশির সুর। আজ সেখানে কেবল ঝিম ধরা প্রকৃতি, স্মৃতির আবরণে ঢাকা পড়ে আছে চেনা মুখ আর কোলাহলের গল্প।
বাজারের ইতিহাস ও গল্প
বুড়ি নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল এই বাজার। দেড় শতকেরও বেশি সময় আগে নদীপথে আসা কার্গো ও নৌকা ভিড়ত এখানে। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, ভৈরব থেকে আসত পণ্য—শাক-সবজি, দুধ-মাছ আর শাড়ি কাপড়। আনন্দ আর ব্যস্ততায় ভরে থাকত সকাল থেকে দুপুর। ছোট-বড় সবাই আসতেন কেনাবেচা আর মিলনমেলায়।
প্রকৃতি আছে, প্রাণ নেই
বাজারজুড়ে এখন কেবল ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি, তালাবদ্ধ দোকান, আর জং ধরা দরজা-জানালা। সাইবোর্ডের রঙ মুছে গেছে সময়ের খোঁচায়। মানুষ না থাকায় জায়গাজুড়ে ঘাস-লতাপাতা। দৃষ্টিসীমায় দেখা যায় নিঃসঙ্গ মসজিদ, গাছঘেরা মন্দির, আর এককোণে নিস্তরঙ্গ পুলিশ ফাঁড়ি।
মানুষের হৃদয়ের গল্প
সোনারামপুর গ্রামের আহসান হাবীব বলেন, “ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই বাজারে এসেছি। নিজের চাষের সবজি বেচে লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছি।” সেই কোলাহলমুখর বাজারে আজ চুপচাপ দাঁড়িয়ে চোখে পানি আনেন তিনি। আরেক বাসিন্দা প্রকৌশলী মনিরুল বলেন, “১৯৮৭ সালের ডাকাতির পর বাজারে একটু ধস নামে। তবে প্রাণ হারায়নি, মানুষ ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নেয়।”
স্মৃতি আর সম্ভাবনার দ্বন্দ্ব
বাজারের পুরোনো নাপিতের গাছ, ঘোষদের মিষ্টির ঘ্রাণ আর জলকেলিতে মেতে ওঠা বুড়ি নদী—সবই আছে স্মৃতিতে। কুমিল্লা ওয়াইডব্লিউসিএ’র সাধারণ সম্পাদিকা আইরিন মুক্তা অধিকারী বলেন, “এই স্থানটি পর্যটনের জন্য দারুণ উপযুক্ত। প্রশাসন একটু নজর দিলেই এটি হয়ে উঠতে পারে কুমিল্লার এক দর্শনীয় স্থান।”
হাঁকডাকহীন স্মৃতি হলেও এখনো নিভে যায়নি সম্ভাবনার দীপ্তি। দু’শো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সিদ্ধিগঞ্জ বাজার হয়তো আরেকবার ফিরে পেতে পারে তার প্রাণ। উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা যদি এক সুতোয় গাঁথা হয়, তাহলে হয়তো আবারও নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসবে সেই চেনা হাঁকডাক—স্মৃতি পেরিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠবে মুরাদনগরের সেই বাজার। মুরাদনগরের ইউএনও আলা উদ্দীন ভূঞা জানান, বাজারটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সড়ক সংস্কারসহ পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী