রফিকুল ইসলামের ম্যুরাল ভাঙচুর নিয়ে কুমিল্লায় শুরু হয়েছে তীব্র জনরোষ ও সমালোচনার ঝড়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রূপকার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের স্মরণে নির্মিত ম্যুরালটি কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে ভেঙে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার সকাল থেকেই ভাঙা ম্যুরালের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে জেলা প্রশাসনের অধীনে কুমিল্লা নগরীর রাজবাড়ি এলাকায় কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের বছর, ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, শহীদ মিনার ও রফিকুল ইসলামের ম্যুরাল উদ্বোধন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোল এবং রফিকুল ইসলামের স্ত্রী বুলি ইসলাম। এই স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করেন রফিকুল ইসলামের পরিবার, যেখানে তাঁর পৈতৃক বাড়িও অবস্থিত।

প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ নারগিছ আক্তার জানান, রফিকুল ইসলামের ভাগনে মেরাজ আহমেদ রাজ অর্থায়ন করে শহীদ মিনার ও ম্যুরাল স্থাপন করেন। তিনি বলেন, “আমরা এতদিন যত্ন সহকারে এ স্থাপনা রক্ষা করেছি। শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীরা এখানে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।”
তবে ভাঙচুরের ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। কলেজ কর্তৃপক্ষেরও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে রফিকুল ইসলামের ম্যুরাল ভাঙচুর নিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শফিউল আহমেদ বাবুল বলেন, “মাতৃভাষাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে রফিকুল ইসলামের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর ম্যুরাল ভেঙে ফেলা জাতির প্রতি অবমাননা।” তিনি দ্রুত ম্যুরালটি পুনঃস্থাপনের দাবি জানান।
জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়ছার সাংবাদিকদের বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে রফিকুল ইসলামের সম্মানে ম্যুরাল পুনঃস্থাপনসহ যা যা প্রয়োজন, আমরা তা করব।”
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, রফিকুল ইসলাম জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে চিঠি দিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাব দেন। তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধা আবদুস সালাম ‘এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে সংগঠন গঠন করে বিশ্বব্যাপী সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালান। এর ফলস্বরূপ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
এই ঐতিহাসিক অবদানের রূপকার রফিকুল ইসলামের ম্যুরাল ভাঙচুর শুধু একটি শিল্পকর্ম ধ্বংস নয়—এটি ইতিহাস, ভাষা এবং আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবমাননার নামান্তর।

আজকের কথা ডেস্ক