প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পাইকগাছায় জীবিত নারীকে ‘মৃত’ দেখিয়ে ওয়ারিশ সনদ! সংবাদ সম্মেলনে জীবিত প্রমাণ

মৃত সনদ
Mohammad Shariful Alam Chowdhury

মৃত সনদ জালিয়াতির অভিযোগে খুলনার পাইকগাছায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি। কপিলমুনি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. রফিকুল ইসলামের সুপারিশে জীবিত এক নারীর নামে ‘মৃত’ উল্লেখ করে ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন তাঁরই ছেলে ও মেয়ে।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার কাশিমনগর গ্রামে। এলাকার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী আশালতা হালদারের ছেলে সত্যজিৎ হালদার, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে প্রভাবিত করে গত ৩১ মে ২০২৫ তারিখে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি ভূয়া ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করেন (স্মারক নং ৩৩৬/২০২৫)। উদ্দেশ্য ছিল তার মায়ের সমস্ত সম্পত্তি এককভাবে দখল করা।

মৃত সনদ
মৃত সনদ জালিয়াতির অভিযোগে খুলনার পাইকগাছায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি। কপিলমুনি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. রফিকুল ইসলামের সুপারিশে জীবিত এক নারীর নামে ‘মৃত’ উল্লেখ করে ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করা হয়। ছবি : সংগৃহিত।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সত্যজিতের এই প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড জানাজানি হলে ২০ জুন এক সালিশ বৈঠকে ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেন, এটি তাঁর ভুল ছিল। কিন্তু ততদিনে সত্যজিৎ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং নিজ ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়। মা আশালতা হালদার ঘরহীন হয়ে পড়েন।

প্রতারনা করে জীবিত মাকে সমাজ ও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে গত ২৮ জুন শনিবার বিকেলে আশালতা হালদার মালোপাড়া দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলনে নিজের জীবিত থাকা প্রমাণ করেন। তিনি বলেন,

“আমি বেঁচে আছি, অথচ আমার ছেলে কাগজে-কলমে আমাকে মেরে ফেলেছে। আমি বিচার চাই।”

এ বিষয়ে তাঁর দুই মেয়ে মুক্তি সরকার ও মমতা বিশ্বাস জানান, ভাই সম্পত্তির লোভে মাকে মিথ্যা ‘মৃত’ বানিয়ে আইনকে বিভ্রান্ত করেছে। প্রতিবেশী ঠাকুর দাস বিশ্বাস বলেন, এমন জঘন্য অন্যায় তিনি জীবনে দেখেননি।

ঘটনার মূল অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুস আলী মোড়ল আত্মগোপনে রয়েছেন। বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন,

“আমি না বুঝে ভুল করেছি। এখন বুঝতে পারছি বড় অপরাধ হয়ে গেছে।”

এ প্রসঙ্গে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহেরা নাজনীন জানান,

“বিষয়টি আমার জানা ছিল না। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মৃত সনদ তৈরি করে জীবিত একজনকে সমাজ ও সম্পত্তি থেকে মুছে ফেলার এই ঘটনা শুধু নৈতিক নয়, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও ভয়াবহ অপরাধ। প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

‘মৃত সনদ’ দিয়ে জীবিত মাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা শুধু নৈতিক নয়, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও ভয়াবহ অপরাধ। একজন সন্তান কীভাবে জীবিত মাকে কাগজে-কলমে মেরে ফেলে? এরচেয়েও লজ্জাজনক হলো, ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানের সুপারিশে এই সনদ ইস্যু! ভুল স্বীকার করে দায় এড়ানো যায় না—এটা ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির নগ্ন উদাহরণ। সমাজ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এমন আরও ‘মৃত’ বানানো হবে জীবিতদের, শুধুই সম্পত্তির লোভে। আশালতা হালদারের সাহসী সংবাদ সম্মেলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বাংলাদেশে এখনও বেঁচে থাকার জন্যও প্রমাণ দিতে হয়। এখন সময় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির, নয়তো এই ‘মৃত সনদ’ একদিন সমাজকে জীবন্ত মৃত বানিয়ে ফেলবে।

প্রিন্ট করুন