প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ৭ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

গ্রামের আড্ডা-সালিশ থেকে মুছে যাচ্ছে হুক্কা, হারিয়ে যাচ্ছে ধোঁয়ার এক ঐতিহ্য

হুক্কা বা ডাবা
মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

হুক্কা বা ডাবা আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনে শুধু একটি ধূমপানের যন্ত্র ছিল না, ছিল একধরনের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম—একত্রিত হওয়ার উপলক্ষ। গ্রামের চৌধুরী বাড়ির উঠোনে কিংবা সাধারণ কৃষকের বারান্দায়—প্রায় সর্বত্রই দেখা যেত একখানি হুক্কা। যার ধোঁয়ার কুন্ডলির সঙ্গে মিশে থাকত দিনের গল্প, সুখ-দুঃখ, বিচার-আচার আর আড্ডার সুর। হুক্কার ধোঁয়া যেন তখনকার সমাজের নিঃশব্দ ইতিহাস বহন করত।

কিন্তু সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রাচীন অনুষঙ্গ।
এক সময় যেসব বাড়িতে হুক্কা ছাড়া আড্ডা শুরুই হতো না, আজ সেসব বাড়িতে হুক্কার অস্তিত্বই নেই। তামাকপানের এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি জায়গা ছেড়ে দিয়েছে আধুনিক সিগারেট, বিড়ি, এমনকি ভয়াবহ নেশাদ্রব্যের কাছে।

হুক্কা বা ডাবা
হুক্কা বা ডাবা আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনে শুধু একটি ধূমপানের যন্ত্র ছিল না, ছিল একধরনের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম—একত্রিত হওয়ার উপলক্ষ। ছবি : কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে তোলা

হুক্কা বা হুঁকা একধরনের ধূমপান যন্ত্র, যার নিচে পানিভর্তি অংশ থাকে। জ্বলন্ত তামাকের ধোঁয়া সেই পানি দিয়ে পরিশ্রুত হয়ে দীর্ঘ নলের মাধ্যমে মুখে প্রবেশ করে। একে বাংলায় বলা হয় ‘ডাবা’, ‘আলবোলা’, বা ‘ফরসি’। সাধারণত নারকেলের খোল বা পিতলের পাত্র দিয়ে তৈরি হতো এই যন্ত্রটি।

তিন-চার দশক আগেও বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরেই ছিল হুক্কার প্রচলন।
সালিশি বৈঠক, বিয়ে-পার্বণ বা জমিদার বাড়ির বৈঠকখানায় অতিথি আপ্যায়নের কেন্দ্র ছিল একটি লম্বা পাইপযুক্ত হুক্কা। এটি শুধুমাত্র ধূমপানের মাধ্যম নয়, বরং একধরনের সামাজিক মর্যাদার প্রতীকও ছিল।

বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা এখনো স্মরণ করেন সে সময়ের কথা।
তাদের ভাষায়, “আমাদের বাবা-দাদারা একদিন হুক্কা না টানলে খাবারও মুখে তুলতেন না। হুক্কার তামুক ঘরে না থাকলে যেন সংসার অচল হয়ে যেত।”

তখন ব্যবহার করা হতো কম নিকোটিনযুক্ত তামাক, যার সঙ্গে চিটাগুড় মিশিয়ে তৈরি করা হতো বিশেষ মিশ্রণ। পানি দিয়ে শোধিত হবার কারণে নিকোটিনের মাত্রাও তুলনামূলকভাবে কম থাকত।

বর্তমানে হুক্কার জায়গা দখল করেছে সিগারেট ও বিড়ি। আরও দুঃখজনক হলো, প্রজন্মের একটা বড় অংশ আজ ভয়ংকর মাদকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হুক্কার মতো ঐতিহ্যবাহী ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর ধূমপান পদ্ধতির প্রচলন টিকে থাকলে, যুবসমাজের কিছু অংশ হয়তো মাদকের দিকে ঝুঁকত না।

আজকের দিনে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও হুক্কার দেখা মেলে না। শহরে তো এটি প্রায় বিলুপ্তই। বর্তমান প্রজন্মের কাছে হুক্কা যেন গল্পের চরিত্র – অনেকে হয়তো নামও শোনেনি।
যার ফলে আমাদের একটি সাংস্কৃতিক উপাদান কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে, নিঃশব্দে।

হুক্কা বা ডাবা ছিল সমাজের আড্ডা, আলোচনার মাধ্যম, আর সামাজিক সম্পর্কের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ সে হুক্কা পরিণত হয়েছে নস্টালজিয়ার ধোঁয়া হয়ে হারিয়ে যাওয়া এক অতীত ঐতিহ্যে।

প্রিন্ট করুন