প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

যুদ্ধের মাঠে যেমন ছিলেন নির্ভীক, জীবনভর ছিলেন খালি গায়ে—আলফু ফকিরকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায়

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা
Mohammad Shariful Alam Chowdhury

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলফু ফকির ছিলেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। শীত, ঝড়, বৃষ্টি—প্রকৃতির কোনো প্রতিকূলতাই তাকে দমাতে পারেনি। জীবনভর লাল সালু পরে, খালি গায়ে, নেড়া মাথায় কাটিয়ে দিয়েছেন দিন। একদিকে যেমন ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক, অন্যদিকে ছিলেন এক অবিস্মরণীয় বীর। আজ তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরবিদায় জানালো তার প্রাণের ভূমি দেবীদ্বার।

বুধবার (২ জুলাই) সকাল ১১টায় দেবীদ্বার উপজেলায় তার মরদেহে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। কুমিল্লা জেলা পুলিশের একটি চৌকস দল বিউগলের করুণ সুরে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। রাষ্ট্রের পক্ষে সালাম গ্রহণ করেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম। এ সময় উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, গণমানুষের প্রতিনিধি এবং এলাকাবাসী পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা
যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলফু ফকির ছিলেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। শীত, ঝড়, বৃষ্টি—প্রকৃতির কোনো প্রতিকূলতাই তাকে দমাতে পারেনি। ছবি : সংগৃহিত।

মরহুমের নামাজে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয় নিজের হাতে তৈরি দরগাহ প্রাঙ্গণে।

🔹 যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলফু ফকিরের ছিলো আলাদা এক চরিত্র

আলফু ফকির (৭৮) ছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের বাজেবাকর গ্রামের প্রয়াত চান মিয়ার সন্তান। তিনি ছিলেন সাধক এলাহী শাহ-এর মুরিদ। মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি লাল সালু পরে খালি গায়ে জীবনযাপন শুরু করেন। মৃত্যুর আগদিন পর্যন্ত কোনোদিন কাপড় গায়ে জড়াননি। শীতে, বর্ষায় কিংবা রোদে—সবসময় নেড়া মাথা, খালি গায়ে চলতেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ছিলেন অনুপস্থিত, কিন্তু ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী।

🔹 স্বাধীনতার যুদ্ধেই জীবন বাজি

১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ—স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র ৫ দিন পরেই, তিনি অংশ নেন ঐতিহাসিক ভিংলাবাড়ি-জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ যুদ্ধ-এ। সেখানে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ১৫ জন পাক সেনাকে পরাজিত করে বাঙালিরা গৌরবময় বিজয় অর্জন করে।

সেই যুদ্ধে বাঙালির হাতে অস্ত্র বলতে ছিল মরিচের গুড়া ও থানার অস্ত্রাগার থেকে লুট করা কিছু রাইফেল। তবুও অদম্য সাহসে তাঁরা প্রাণপণ লড়াই করে শহীদ হন ৩৩ জন, আহত হন অর্ধশতাধিক। গুলিবিদ্ধ হন আলফু ফকির নিজেও—ডান হাতে।

এই যুদ্ধ ছিল দেবীদ্বারের মাটিতে বাঙালির প্রথম বিজয়। আর যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলফু ফকির ছিলেন সেই বিজয়ের জীবন্ত কিংবদন্তি।

🔹 জানাজার পূর্বে শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ

মরহুমের জীবন ও কর্ম নিয়ে বক্তব্য রাখেন সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আব্দুস সামাদ, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মুস্তাকুর রহমান ফুল মিয়া মাস্টার, উপজেলা প্রেসক্লাব সভাপতি এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, ‘আমাদের দেবীদ্বার’ পত্রিকার সম্পাদক এটিএম সাইফুল ইসলাম মাসুম, সমাজসেবক মো. আনোয়ার হোসেন এবং মো. ছোবহান চৌধুরী প্রমুখ।

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলফু ফকির ছিলেন সেই বিজয়ের জীবন্ত কিংবদন্তি, যিনি অস্ত্রহীন জাতিকে প্রথম জয়ের স্বাদ এনে দিয়েছিলেন। দেবীদ্বারের মানুষ আজ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাকে শেষ বিদায় জানাল।

প্রিন্ট করুন