প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

জেনারেল ওয়াকার-ইউনূস বোঝাপড়ায় গভীর হচ্ছে রাজনৈতিক সংকট

yunus waker
Mohammad Shariful Alam Chowdhury

জেনারেল ওয়াকার ও ইউনুসের বোঝাপড়ায় দীর্ঘায়িত বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকট: ক্ষমতা কাঠামোর নেপথ্যে কারা চালকের আসনে?

জেনারেল ওয়াকার এবং মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যকার পর্দার আড়ালের বোঝাপড়া আজকের বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। একজন সেনাপ্রধান হয়েও ওয়াকার যেভাবে ইউনূস সরকারের টিকে থাকার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন, তা শুধু আশ্চর্যের নয়—গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার ভবিষ্যতের জন্য তা ভয়ানক বিপদের পূর্বাভাসও বটে।

জেনারেল ওয়াকার
শেখ হাসিনার আত্মীয় পরিচয়ে বিশেষ সুবিদা নেন এ ওয়াকারুজ্জামান। ছবি : সংগৃহিত।

একদিকে সেনাপ্রধান ওয়াকার নিজেকে নিরপেক্ষ বললেও বাস্তবতায় তিনি বারবার এমন ভূমিকা রেখেছেন যা ‘অরাজনৈতিক পেশাদারিত্ব’কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার সময় সেনাবাহিনীকে ছাত্রদের উপর গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত, পরে ভারতীয় সেনাপ্রধান ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ফোনে শেখ হাসিনাকে ভারতে পাঠানোর আয়োজন, জামাতকে সবার আগে বৈঠকে ডাকা, এবং ইউনূসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা—সবই প্রমাণ করে তিনি শুধু একজন সেনাপ্রধান নন, বরং রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।

অন্যদিকে মুহাম্মদ ইউনূস মূলত পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত ডিপ স্টেটের প্রিয়পাত্র। তাঁকে সামনে রেখে নতুন এক ধরনের ‘ডিপ পার্লামেন্টারি স্ট্রাকচার’ কায়েম করা হচ্ছে, যেখানে জনগণের ভোট বা গণতন্ত্র কেবল মুখরোচক বুলি মাত্র। ওয়াকার এখানে দায়িত্ব নিয়েছেন ভারসাম্য রক্ষার—ভারত, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানকে সামলে দেশের ভিতরে ইউনূসের সরকারকে দীর্ঘায়িত করতে।

সেনাসদরে দরবার ডেকে ওয়াকার যখন সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে ১০ দফা তুলে ধরলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন—তিনি বুঝি ‘ঘুম ভেঙে’ উঠেছেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ইউনূস নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ নাটক করে আবারও নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিলেন। বিএনপি ও অন্যান্য দলও ওয়াকারের পাশে না দাঁড়িয়ে নির্বাচন দাবি করেই থেমে গেল।

জামাত এর মধ্যেই দেশের প্রশাসন, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা—সব জায়গায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। আজহার মুক্তি, মূর্তি ও ম্যুরাল ধ্বংস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী হামলা সবই চলছে সেনাবাহিনীর চোখের সামনে, কখনো কখনো তাদের অংশগ্রহণে। অথচ ওয়াকার বরাবর ‘নির্বিকার’। ফলে এই অবস্থা প্রমাণ করে জামাত-ইসলামিস্টদের ‘নতুন বন্দোবস্ত’কেই সমর্থন দিচ্ছেন তিনি।

এদিকে সেনাবাহিনীর ভেতর থেকেও ইউনূস সরকার ওয়াকারের বিরুদ্ধে ক্যু চেষ্টা চালায়। সেনাপ্রধান তখন ক্ষমতা আরও সংহত করলেও সরকার বদলের পথে অগ্রসর হননি। বরং তিনি রাশিয়া সফর শেষে ফিরে এসে আবারো সেনা দরবার ডেকে সরকারকে ‘নরম বার্তা’ দিলেন।

সাম্প্রতিক মব ভায়োলেন্স, মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল ভাঙা, কে এম নূরুল হুদার গলায় জুতার মালা পরানো, এবং সরকারের মদতে চলা বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধেও জেনারেল ওয়াকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি—বা নেননি।

❝ তাহলে কি তিনি শেষ বিচারে ইউনূসের লোক? ❞

পর্যবেক্ষণ বলছে, জেনারেল ওয়াকার ও মুহাম্মদ ইউনূস উভয়ই ক্ষমতা কাঠামোর দুই মেরু হলেও একে অপরের পরিপূরক। ওয়াকার সামলাচ্ছেন সামরিক-অভ্যন্তরীণ-আঞ্চলিক ভারসাম্য, আর ইউনূস সামলাচ্ছেন পশ্চিমা অনুমোদন। ফলে দুইজন মুখোমুখি দেখালেও মূলত একই ছাতার নিচে অবস্থান করছেন।

তাই যেসব আওয়ামীপন্থী বা বিএনপি ঘরানার মানুষ ভেবে বসে আছেন, ওয়াকার একদিন শেখ হাসিনাকে বা বিএনপিকে ফিরিয়ে আনবেন, তারা ভয়ানক ভুল করছেন। তার অবস্থান ও অভিলাষ ‘অরাজনৈতিক’ বলে যতই প্রচার হোক, বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকটের সমাধান তাঁর ‘নিরপেক্ষতা’ নয়, বরং তার অবস্থান পরিবর্তনের ওপরই নির্ভর করছে।

জেনারেল ওয়াকার যদি সত্যিই মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন, তাহলে আজকের বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকট এতটা গভীর হত না। বরং দেখা যাচ্ছে, দৃশ্যমান বিরোধিতার আড়ালে দুইজনই একই ক্ষমতা কাঠামোর নিরাপদ খেলোয়াড়—যারা জনগণের শ্বাসরুদ্ধ গণতন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের শর্তে রাষ্ট্র চালিয়ে যাচ্ছেন।


🔑 সারসংক্ষেপ (চুম্বক পয়েন্ট):

  • জেনারেল ওয়াকার দৃশ্যত নিরপেক্ষ হলেও কার্যত ইউনূস সরকারের চালিকাশক্তি
  • জামাত-ইসলামিস্টদের প্রশাসনে প্রভাব বেড়েছে, মব ভায়োলেন্সে সেনা নীরব
  • ওয়াকারের ভারত-রাশিয়া সংযোগ বনাম ইউনূসের পশ্চিমা মদত
  • সেনাবাহিনীর ‘আনুষ্ঠানিক বিরোধিতা’ও কার্যত দৃশ্যভ্রম মাত্র
  • নির্বাচন পিছোলে সবচেয়ে লাভবান জামাত, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিএনপি

প্রিন্ট করুন