প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি আজ নিজ ভিটায়ই উপেক্ষিত, ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া এই মানুষটিকে ভুলছে দেশ!

Untitled design 20250704 193108 0000
Mohammad Shariful Alam Chowdhury

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি আজ নিজ ভিটায়ই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যেতে বসেছে। ভাষার জন্য যিনি পাকিস্তানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছিলেন, স্বাধীনতার আগে যিনি ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে মুখ খুলেছিলেন—সেই শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আজ অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কুমিল্লার ঝাউতলা এলাকায়।

১৯৪৮ সালে করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে দাঁড়িয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, ‘‘বাংলা হবে রাষ্ট্রভাষা!’’ তাঁর সেই দাবিই ছিল ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপণের মুহূর্ত। অথচ আজ ২০২৫ সালে দেখা যাচ্ছে—তাঁর কুমিল্লার সেই বাড়িটি পড়ে আছে ভুতুড়ে অবস্থায়; স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, ভাঙাচোরা টিনের চালা আর স্মৃতিশূন্য পরিবেশে ঢাকা।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি আজ নিজ ভিটায়ই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যেতে বসেছে। ভাষার জন্য যিনি পাকিস্তানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছিলেন। ছবি : দৈনিক আজকের কথা।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি আরও করুণ হয়ে ওঠে এই কারণে যে, ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ হানাদার বাহিনী তাঁকে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আর কোনোদিন পরিবারের কাছে ফিরে আসেননি তিনি। তাঁর মরদেহও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

২০১০ সালে তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বাড়িটি পরিদর্শন করে ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি জাদুঘর’ গড়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তা আজও আলোর মুখ দেখেনি। জেলা প্রশাসনের ভাষ্য—বাড়িটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ইতিহাস ও ভাষা গবেষকদের মতে, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি শুধু একটি ব্যক্তি নয়, এটি জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে নেই কোনো নামফলক। চারদিকে ছড়িয়ে আছে আবর্জনা। পেছনের অংশ ভেঙে পড়েছে। সামনের টিনশেড যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লার মুরাদনগরের নেয়ামতকান্দি গ্রামের সুজন মিয়ার পরিবার এই বাড়িতে বসবাস করছে। তাঁর স্ত্রী জাহানারা বেগম জানান, “আমরা শুধু দেখাশোনা করি, মালিকের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেই না। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলেই থাকছি।”

ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি, সাবেক এমপি আরমা দত্ত বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে সবাই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা মনে রাখে। বাকি সময় কেউ খোঁজ নেয় না। বাড়িটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি হলেও সংরক্ষণে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই।”

অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়ছার বলেন, “আমরা জেনেছি, পরিবার ইতিমধ্যে ওই সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছে। তাই প্রশাসনের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় চাইলে অধিগ্রহণ করতে পারে।”

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি আজ নিজ ভূমিতে পড়ে আছে অবহেলায়, অযত্নে, নির্জনতায়। রাষ্ট্র যখন ভাষা দিবসে ফুল দেয়, তখন প্রশ্ন জাগে—এই মানুষটি কি শুধুই ফেব্রুয়ারির জন্য?

প্রিন্ট করুন