স্বপ্ন পূরণে বাধা একটি তারিখ বিভ্রান্তি, ভ্যানচালকের মেয়ের ভর্তি বাতিল
ভ্যানচালকের মেয়ের ভর্তি বাতিল হওয়া যেন মেধা আর স্বপ্নের ওপর এক নির্মম আঘাত। যশোরের প্রত্যন্ত এক গ্রামের ভ্যানচালক আসাদুল বিশ্বাস দিনের পর দিন কষ্ট করে যে স্বপ্ন দেখেছেন—তার মেয়ে মীম আখতার শিখা একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, সেই স্বপ্নে দেখা দিয়েছিল বাস্তবতার আলো। কিন্তু একটি তারিখ বিভ্রান্তি তাদের সেই স্বপ্নকে তছনছ করে দিয়েছে। মেধাবী ছাত্রীর ভর্তি বাতিল এ খবরে সবাই হতাশ।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে মেধাতালিকায় স্থান পান মীম। বাবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থে ভর্তি ফি অনলাইনে পরিশোধও করেন সময়মতো। কিন্তু কাগজপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ভুল বোঝার কারণে, ১ জুলাইয়ের পরিবর্তে ৭ জুলাই কাগজপত্র নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান তারা।

গন্তব্যে গিয়ে জানতে পারেন, সময় শেষ। আর কোনো সুযোগ নেই। মীম ও তার বাবা হতবাক হয়ে যান। কোনো প্রতিনিধি সহানুভূতি দেখাননি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ফিরিয়ে দেন কোনো বিবেচনা না করে।
মীম বলেন,
“ভর্তি ফি দিয়েছি, মেধাতালিকায় ছিলাম, শুধু কাগজ জমা দিতে গিয়ে তারিখ ভুল হয়েছে। এটা কি শুধুই আমাদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে সব শেষ হয়ে যাবে?”বাবা আসাদুল বিশ্বাস বলেন,
“মেয়েটা চান্স পেয়েছে শুনে খুশিতে কাঁদছিলাম। ধার-দেনা করে ভর্তি ফি জুগিয়েছি। এখন আমার মেয়েটা চোখে-মুখে অন্ধকার দেখে। কিভাবে বলি, সব শেষ?”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে বিতর্ক। নেটিজেনরা বলছেন, একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান শুধু নিয়মের ফাঁদে পড়ে যদি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে কীভাবে প্রতিভা বিকশিত হবে?
বিশেষ করে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট এমন একটি বিভাগ যেখানে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা গড়তে গিয়ে প্রতিভাবান ছাত্রীদের প্রয়োজন। মীম এমনই একজন হতে পারতো, যিনি দেশের পর্যটনখাতে অবদান রাখতেন।
পরিবারের আবেদন: “বিশ্ববিদ্যালয় একটু মানবিক হোন।”
তারা বলছেন, “আমরা ভর্তি ফি দিয়েছি, চান্স পেয়েছি। কেবল তারিখ বিভ্রান্তির কারণে মেয়েটা যেন জীবনের সুযোগ হারিয়ে না যায়। দয়া করে মানবিক দিক বিবেচনায় পুনঃভর্তির ব্যবস্থা করা হোক।”
একটি গরিব পরিবারের সন্তান হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া মানে শুধু উচ্চশিক্ষা নয়—এটা একটি পরিবারকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনার পথ। মীম সেই পথেই চলছিল, কিন্তু প্রশাসনিক ‘তারিখের জাল’ তাকে থামিয়ে দিল।
মেধাবী ছাত্রীর ভর্তি বাতিল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—
বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধুই নিয়মের সংস্থা, নাকি সেখানে হৃদয়ের জায়গাও থাকা উচিত? যদি নিয়মের কঠোরতায় প্রতিভা, স্বপ্ন আর মেধা হারিয়ে যায়, তাহলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আসলে কাদের জন্য?

Mohammad Shariful Alam Chowdhury