প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

বাল্যবন্ধু আমির হোসেন: শুশুন্ডার সেই ওরশ থেকে জীবনের স্মৃতির মায়াজাল

আমির হোসেন
মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

বাল্যবন্ধু আমির হোসেন, ছোটবেলার দুষ্টুমি থেকে আজকের হৃদয়ের বন্ধুত্বের গল্প

বাল্যবন্ধু আমির হোসেন, আমার জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়। ছোটবেলা থেকে শুরু করে আজও তার স্মৃতিতে হৃদয় ভরে ওঠে, যেন এক সোনালি দিনের গল্প যা ভুলবার নয়। আমরা একসাথে মাদ্রাসার মক্তবে পড়তাম, শৈশবের দুষ্টুমি, হাসি-আনন্দ আর একান্ত বন্ধুত্বের গল্প গড়ে উঠেছিলো সেই ছোট্ট গ্রাম বাংলার রাস্তায়।

আমিরের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক জীবনকালের একান্ত ভালোবাসার ছবি। তাকে আমরা মজা করে ডাকতাম ‘বুতুইল্লা’, যদিও কেন সেই ডাকনাম দিয়েছিলাম তা আজও মনে নেই। তবে ‘আমির’ নামটাই ছিল তার পরিচয়, আর সে পরিচয়েই আমাদের বন্ধুত্বের বুনিয়াদ। আমরা প্রতিদিন সকালে মাদ্রাসায় যেতাম, মক্তবে কোরআনের পাঠ করতাম, কিন্তু তার পাশেই ছিল দুষ্টুমি আর বন্ধুত্বের গাঢ় বন্ধন।

বাল্যবন্ধু আমির হোসেন
বাল্যবন্ধু আমির হোসেন তুমি ভালো থেকো, তুমি যেনো কখনো ভুলে না যাও আমাদের সেই দুষ্টুমি আর বন্ধুত্বের রাতগুলো। ছবি : সংগৃহিত।

আমির ছিল বুদ্ধিমান ও দুষ্টু ছেলে, কিন্তু কখনো খারাপ কাজে তাকে দেখিনি। সে একসময় আকিজ বিড়ি খেতো, প্রায় সময় আমায় বলত, “আয়, এক টুকরা আকিজ বিড়ি খাই, তারপর চল, আজকে শুশুন্ডার ওরশে যাবো। ওখানে গান-বাজনা, নাচ-গান আর খিচুরির মজা অন্যরকম।” আসলেই ওরশের খিচুরির স্বাদ ছিল অন্যরকম, আর আমিরের সঙ্গে সেই স্মৃতিগুলো আজও আমার হৃদয়ের কোনায় অমলিন।

একবার এমন এক রাত ছিল যখন আমাদের এলাকায় কোনো ওরশ ছিল না। রাত প্রায় ১০-১১টা, আমি, আমির, মিজান (যিনি এখন দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষক), ইব্রাহিম, হারুন, আর ভাগিনা কাশেম মিলে ওরশের খোঁজে বের হয়েছিলাম। আমরা হেঁটে হেঁটে পায়ব পর্যন্ত গিয়েছিলাম, কিন্তু কোথাও কোনো গান-বাজনার শব্দ শোনা গেল না। আশেপাশের মানুষদের জিজ্ঞেস করলাম, কেউ জানে কি কোথাও ওরশ বা গান-বাজনা হচ্ছে কিনা? তখন এক মুরব্বী আমাদের গোমতীর পাশে একটি উচ্চ জায়গা দেখিয়ে বললেন, “ওই দিকে ওরশ চলছে, যাও।” আমরা তখন আকিজ বিড়ি হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।

অনেকদূর গিয়ে দেখি, সত্যিই একটা বড় গানের আসর বসেছে। আমাদের বন্ধু এসাক সরকার গান গাইছিলেন। তাকে দেখে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আয়োজকদের মাধ্যমে আমাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করালেন। আমরা সবাই বসে গান শুনলাম, নাচলাম, আর শেষে খিচুরি খেয়ে সকালে বাড়ি ফিরলাম। সেই রাতের স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ের সবচেয়ে মধুর অধ্যায়।

আমিরের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত। আমি আজও ভাবি, আমার বাল্যবন্ধু আমির হোসেন আজ কোথায় আছেন, কেমন আছেন? শুনেছি, আমির অনেক বদলে গেছেন, অনেক ভালো আছেন—এই খবরটা পেয়ে আমার মন শান্তি পায়। আমিরের বড় বোন নাজমা বেগম নাজুও ছিল আমার স্কুলের ক্লাসমেট, যদিও আমির স্কুলে পড়েননি, তিনি শুধু মাদ্রাসার মক্তবে পড়েছেন। আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর সঙ্গে তার নাম অমোঘভাবে জড়িত।

আমার মনে হয়, বন্ধুত্ব এমনই এক সম্পর্ক যা সময়ের কাছে অসহায়। দিন পরিবর্তিত হয়, মানুষ বদলায়, কিন্তু ভালোবাসা আর স্মৃতি চিরদিন অমলিন থেকে যায়। আমির আমার শুধু বন্ধু নয়, বরং শৈশবের সেই নিরাপদ আশ্রয়, যেখান থেকে শুরু হয়েছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় অধ্যায়। আমি তার জন্য সবসময় শুভকামনা করি, সে যেন ভালো থাকে, সুখী থাকে—আর একদিন অবশ্যই তার জীবনের নতুন গল্পগুলোও শেয়ার করবো।

বাল্যবন্ধু আমির হোসেন তুমি ভালো থেকো, তুমি যেনো কখনো ভুলে না যাও আমাদের সেই দুষ্টুমি আর বন্ধুত্বের রাতগুলো।

প্রিন্ট করুন