সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর লুটপাট করার পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ৫২ জন প্রভাবশালীর নাম প্রকাশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তালিকায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যসহ খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর কর্মকর্তারা রয়েছেন।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর এলাকা থেকে কয়েকশ কোটি টাকার পাথর উত্তোলন ও লুটপাট হয়েছে। খনিজ সম্পদ অধিদপ্তর, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, কোম্পানীগঞ্জের চার ইউএনও, থানা ও বিজিবির কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ঘটনায় জড়িত। এছাড়া স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও এনসিপির নেতাদেরও নাম উঠে এসেছে।
দুদকের অভিযান ও তদন্ত
১৩ আগস্ট দুদকের সিলেট সমন্বিত কার্যালয়ের পাঁচ সদস্যের একটি দল উপপরিচালক রাফী মো. নাজমুস সাদাতের নেতৃত্বে সাদাপাথর এলাকায় অভিযান চালায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের সহায়তায় সরকারি পর্যটন ও নদী তীর থেকে পাথর চুরি করে স্টোন ক্রাশার মিলের মাধ্যমে তা ধ্বংস করা হয়েছে।
পাথরের অবৈধ উত্তোলন চলেছে বিশেষ করে গত তিন মাস ধরে, যদিও পর্যটন এলাকা সংরক্ষিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৮০% পাথর স্থানান্তর করা হয়েছে, যার ফলে গর্ত ও বালুচরের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশাসন ও সরকারি কর্মকর্তাদের দায়
দুদকের প্রতিবেদনে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোকে অবহেলার জন্য দায়ী করা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী খনিজ সম্পদ উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে দায়ী করে বলা হয়েছে, তারা পাথর লুটপাটে সরাসরি বা ইঙ্গিতমূলকভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় পাথর লুট দীর্ঘদিন অব্যাহত হয়েছে।
পুলিশ সুপার ও কোম্পানীগঞ্জ থানার কর্মকর্তা, ইউএনওদেরও দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, প্রতি ট্রাক অবৈধ পাথর উত্তোলনের খরচ ও কমিশন ভাগাভাগি করা হতো, পুলিশ ও প্রশাসন উভয়ই এতে অংশগ্রহণ করেছে। বিজিবি পোস্ট থেকেও আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে পাথর লুট সহজভাবে চালানো সম্ভব হয়েছে।
রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ীদের নাম
দুদকের প্রতিবেদনে বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও এনসিপির ৪২ জন রাজনৈতিক নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপি: রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, সাহাব উদ্দিন, হাজি কামাল, লাল মিয়া, সাজ্জাদ হোসেন ওরফে দুদু, রুবেল আহমেদ বাহার, মো. দুলাল মিয়া ও অন্যান্য।
আওয়ামী লীগ: বিলাল মিয়া, শাহাবুদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, আবদুল ওদুদ আলফু, মনির মিয়া, হাবিল মিয়া, সাইদুর রহমান।
জামায়াত: মো. ফকরুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন।
এনসিপি: নাজিম উদ্দিন, আবু সাদেক মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।
অতিরিক্ত ১১ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীও তালিকায় রয়েছে।
নেতাদের প্রতিবাদ
নাম প্রকাশিত নেতারা দাবি করেছেন, তারা পাথর লুটপাটে জড়িত নন। সিলেট মহানগর বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, “দুদকের প্রতিবেদন ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” তারা চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, প্রমাণ দেখালে শাস্তি মেনে নেবেন।
সাদাপাথর লুটপাট তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দুদকের উদ্যোগে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও দণ্ড নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী