প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান “জয় বাংলা” বলায় কলেজছাত্র গ্রেপ্তার: সরকারের আচরণে নতুন বিতর্ক

image 241732 1763454045
মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

জয় বাংলা – টিকটক ভিডিওর জন্য গ্রেপ্তার কলেজছাত্র, শিক্ষার্থী-অধিকার ও সরকারের দায়বদ্ধতা প্রশ্নে

জয় বাংলা – ফেনীর পরশুরামে ‘জয় বাংলা, জিতবে আবার নৌকা’ গানের সঙ্গে টিকটক ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে পোস্ট করার কারণে খন্ডল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র কামরুল হাসান (১৭)কে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনাটি কেবল একজন শিক্ষার্থীর স্বাধীন সাংস্কৃতিক প্রকাশের অধিকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সরকারের ক্রমবর্ধমান কড়া নিয়ন্ত্রণ নীতি, পুলিশি আচরণ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি উদাসীনতারও প্রতিফলন।

কামরুলের বাবা সুজায়েত খান ছুট্ট মিয়া বলেন, “আমার ছেলে শিক্ষার্থী, রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। সে শুধু গান ব্যবহার করে ভিডিও বানিয়েছিল। পুলিশ রাতে এসে তাকে তুলে নিয়ে গেছে। আমরা ভয় পাচ্ছি, এই ধরনের ঘটনা শিক্ষার্থীদের উপর মানসিক চাপ তৈরি করছে।” বাবার বক্তব্য দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অসন্তোষের প্রতিফলন। এক অসুস্থ পিতার জন্য সন্তানের উপর এমন দমনমূলক আচরণ মানবিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার ছাত্রলীগের নিষিদ্ধ অংশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিমত, এই অভিযোগের ভিত্তি প্রমাণিত নয় এবং শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক প্রকাশকর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরশুরাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ নুরুল হাকিম জানিয়েছেন, “গ্রেপ্তার কামরুল এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষের মামলায় আসামি।” কিন্তু এ ঘটনায় শিক্ষক, বাবা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে দেখা যায়, ঘটনার মূল কারণ শুধুমাত্র ‘জয় বাংলা’ গানের ব্যবহার।

এই গ্রেপ্তারের পেছনে রয়েছে সরকার ও প্রশাসনের এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বময় মনোভাব। একদিকে তারা স্বাধীন প্রকাশের স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীর উপর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার নথি চাপিয়ে তাকে ভয় দেখাচ্ছে। ‘জয় বাংলা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের ইতিহাসের অংশ, যা দেশের সর্বজনীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। একে বন্ধ করা বা এর জন্য শাস্তি আরোপ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে এবং সমাজে বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এ ঘটনা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। যারা ‘জয় বাংলা’, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান বা ইতিহাসের প্রতীক ব্যবহার করবে, তাদের উপর সরকারি নজরদারি ও দমনমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কা। এটি শুধু কামরুলের ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকেত, যা নির্দেশ করছে যে শিক্ষার্থীর সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা আজ সরকারের দৃষ্টিতে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’।

জয় বাংলা – এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীন প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা, পুলিশি আচরণে মানবিকতা এবং সরকারের দমনমূলক নীতি পুনর্মূল্যায়ন। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত: সাংস্কৃতিক প্রকাশ ও ইতিহাসের সম্মান রক্ষায় সরকার ও প্রশাসন কতটা দায়িত্বশীল।

প্রিন্ট করুন