বাঁশের কুটির শিল্প—তিতাসে টিকে থাকা বহু প্রজন্মের সংগ্রাম
বাঁশের কুটির শিল্প দেশের নানা জায়গায় হারিয়ে যেতে বসেছে, কিন্তু কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কলাকান্দি ইউনিয়নের বড় মাছিমপুর গ্রামের নমসুধ পাড়া যেন এখনো দাঁড়িয়ে আছে এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে। এখানে প্রায় ৫০টি পরিবারের জীবন চলে এখনো সেই পুরোনো কুলা, ডালি, খাঁচা, ছালুন তৈরির ওপর—যা একদিকে তাদের জীবিকা, অন্যদিকে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অমূল্য প্রতিচ্ছবি।
ভোর হলেই গ্রামের অলিগলিতে শোনা যায় বাঁশ চিরার খটমট শব্দ, রোদে শুকানো অর্ধসমাপ্ত পণ্যের গন্ধ, আর ঘরে ঘরে বসে থাকা নারী–পুরুষ–শিশুর টানা কাজ। কোনো পরিবারে ছেলে চিরছে বাঁশ, মা বুনছেন ছালুন, বাবা রোদে শুকাচ্ছেন কুলা—পুরো পরিবারটাই যেন একটি ক্ষুদ্র কারখানা।
বাঁশশিল্পী সুধন চন্দ্র নমঃ (৫৫) বলেন,
“ছোটবেলা থেকে এই কাজ করছি। তখন বাঁশের দাম কম ছিল—সপ্তাহে অনেক কিছু বানানো যেত। এখন বাঁশের দাম বেশি, তাই সপ্তাহে ২০–২৫টা কুলাই বানাতে পারি।”
পাইকাররা নিজেরাই এসে সংগ্রহ করে নেয়—কুলা পাইকারি ১২০–১৫০ টাকা, খুচরা ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। হাঁস–মুরগির খাঁচার দাম ৭০–৮০ টাকা।
সুধনের আক্ষেপ,
“সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি। একটু সাহায্য মিললে কাজটা আরও বড় পরিসরে করা যেত।”
গৃহবধূ অঞ্জনারানী জানান,
“আমি আর স্বামী দুজনেই এই কাজ করি। বাঁশের দাম বাড়ায় উৎপাদন কমে গেছে।”
স্থানীয়রা বলেন—প্লাস্টিকের দুনিয়ায় বাঁশের পণ্যের চাহিদা কমলেও এটি এখনো জনপ্রিয়, বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব বলে। তাই নমসুধ পাড়ার কারিগররা শুধু জীবনধারণই করেন না, গ্রামবাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্যকে আগলে রাখেন দৈনন্দিন শ্রম দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত বলতে হয়—বাঁশের কুটির শিল্প শুধু একটি কারিগরি পেশা নয়; এটি বহু প্রজন্মের স্মৃতি, সংগ্রাম এবং হাতে গড়া সেই বাংলার ঐতিহ্য, যা এখনো টিকে আছে তিতাসের নমসুধ পাড়ার অক্লান্ত মানুষের ঘামে।

ফাহিমা বেগম প্রিয়া