১৫০০ কোটিতে ‘নগদ’ কিনছে আবুল খায়ের

গ্রাফিকস : দৈনিক আজকের কথা ও জয় বাংলার জয়
ডাক বিভাগের ব্র্যান্ড ব্যবহার করে পরিচালিত হলেও মালিকানা, অনুমোদন ও আর্থিক কাঠামো নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্কে থাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ‘নগদ’ নতুনভাবে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, মামলা, নিয়ন্ত্রক জটিলতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় থাকা প্রতিষ্ঠানটিতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন আসছে। নগদ কিনে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। নগদের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার দায় রয়েছে, যা পরিশোধ করবে আবুল খায়ের গ্রুপ। হাতবদলের মূল্যসহ মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দায় শোধের পর সরকার পাবে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সিআইডির করা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি প্রয়োজন হবে। এর আগে সৌদি আরবভিত্তিক একটি শিল্পগোষ্ঠী প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকায় নগদ অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখালেও তাতে শেষ পর্যন্ত সায় দেয়নি সরকার।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, কোটি কোটি গ্রাহকসম্পন্ন এই প্ল্যাটফর্মকে টিকিয়ে রাখতে বড় ধরনের মূলধনী সহায়তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও শক্তিশালী করপোরেট ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। সে কারণেই বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আবুল খায়ের গ্রুপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামে একটি ছোট বিড়ি কারখানা হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিকস, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য, তামাক এবং দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনে বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
গত বৃহস্পতিবার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে এ সংক্রান্ত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে নগদের দায়দেনা ও মামলার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে আবুল খায়ের গ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম এবং অনুমোদিত কোনো অর্থ ছাড়াই ৬০০ কোটি টাকার ‘ফেইক’ বা অবৈধ ই-মানি তৈরি করে। নগদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই রিয়েল মানি সংরক্ষণ ছাড়া অতিরিক্ত অন্তত ৬০০ কোটি টাকা ই-মানি ইস্যু করে। অর্থাৎ ৬০০ কোটি টাকার ‘ফেইক’ বা অবৈধ ই-মানি বাজারে ছাড়ে। কোনো প্রকৃত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে সংরক্ষিত না রেখেই এই ডিজিটাল অর্থ তৈরি করে লোপাট করা হয়।
বিষয়টি সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো গ্রাহকের নগদ অ্যাকাউন্টে ৫ হাজার টাকা দেখা গেলে সেটিই ই-মানি। দেশে ই-মানি বা ডিজিটাল অর্থের লেনদেন ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দিষ্ট কিছু তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে আন্তঃব্যাংক সেটেলমেন্ট পরিচালনা করে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সার্ভিস, ডিজিটাল ওয়ালেট ও ই-মানি ইস্যুর ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকৃত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু নগদ ৬০০ কোটি টাকার বিপরীতে কোনো অর্থ সংরক্ষণ না করেই সমপরিমাণ ই-মানি বাজারে ছাড়ে, যা এখন প্রতিষ্ঠানটির দায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থায় বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যাংক যুক্ত থাকলেও এমএফএস ও ডিজিটাল সেটেলমেন্টে সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সাধারণত রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলিয়ে প্রায় ১৬টি ব্যাংক বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নেয়। এর মধ্যে রয়েছে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট ব্যাংক।
জানা গেছে, এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলা ও তারল্য সংকট কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছিল। আবুল খায়ের গ্রুপ সেই উদ্যোগে এগিয়ে এসেছে। সরকারের ধারণা, শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা নগদের মতো বড় পরিসরের ফিনটেক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও নগদের বিশাল গ্রাহকভিত্তি রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সাড়ে ৫ কোটি গ্রাহক রয়েছে এবং দৈনিক লেনদেন ৭০০ কোটি টাকার বেশি। এমএফএস বাজারে বিকাশের পরই নগদের অবস্থান। বড় এই বাজার ও নেটওয়ার্ক যেকোনো বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক সুযোগ বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা। সরকার ও ডাক এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ধারণা, আবুল খায়ের গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নগদের ওপর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।
নগদ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে নিজস্ব আয় দিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এখনো লাভজনক অবস্থায় যেতে পারেনি। মূলত ‘ব্রেক ইভেন’ অবস্থায় রয়েছে। চলতি মাস পর্যন্ত নগদে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক মিলিয়ে প্রায় ৮০০ কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে নিয়মিত কর্মী ৬২৫ জন। প্রতিষ্ঠানটির মাসিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ব্যয় কমাতে বিজ্ঞাপন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লোকবলও কমানো হয়েছে। বড় অফিস ছেড়ে ছোট পরিসরে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নগদের মূল আয়ের বড় অংশ আসে ব্যাংকে সংরক্ষিত অর্থের সুদ থেকে। প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা সুদ আয় হয়। তবে মোবাইল আর্থিক সেবার সবচেয়ে বড় খাত ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট থেকে কার্যত কোনো মুনাফা পায় না প্রতিষ্ঠানটি। কারণ এ খাতের প্রায় পুরো কমিশন চলে যায় এজেন্টদের কাছে। নগদ পেমেন্ট সেবায় গ্রাহকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য চার্জও নেয় না। বরং প্রতি হাজার টাকায় ১ থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত কমিশন নেয়। অন্যদিকে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার রেমিট্যান্স আসে নগদের মাধ্যমে। এটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, বড় গ্রাহকভিত্তি ও উচ্চ দৈনিক লেনদেনের কারণে এখনও নগদের বাজার সম্ভাবনা রয়েছে। সহজে হিসাব খোলার সুবিধা ও ব্যবসায়িক কৌশলের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সেবাটি। পাশাপাশি বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও পেয়েছে নগদ। ফলে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি গ্রাহক নিবন্ধন নিয়েছেন।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট নগদের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে উচ্চ আদালত তা অবৈধ ঘোষণা করলে দায়িত্ব নেয় ডাক অধিদফতর। ডিজিটাল ফাইন্যান্স ও এমএফএস ব্যবসা পরিচালনায় সরকার সমর্থ নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডাক বিভাগও এককভাবে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা পরিচালনার সক্ষমতা রাখে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, নগদকে ডাক অধিদফতরের হাত থেকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, নতুন বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে, কারণ ডাক অধিদফতরের পক্ষে এটি পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগদ কেনার বিষয়ে ঢাকা-১৪ আসনের এমপি ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ওই সময় গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে আগ্রহী।
২০১৯ সালের ২৬ মার্চ আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে ‘নগদ’। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে ‘ডাক বিভাগের ডিজিটাল লেনদেন’ হিসেবে প্রচার করে। সরকারি লোগো ও রাষ্ট্রীয় আস্থার সুযোগ নিয়ে কীভাবে একটি বেসরকারি গোষ্ঠী কয়েক হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে এবং মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের প্রভাব বিস্তার হয়েছে।
এ সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। শুরু থেকেই ‘নগদ’কে সরকারি সেবা হিসেবে প্রচার করা হলেও নথিপত্রে এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ‘থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডাক অধিদফতরের ব্র্যান্ড ব্যবহার করে এ ব্যবসা শুরু করে। চুক্তিতে মুনাফা ভাগাভাগির কথা থাকলেও ডাক অধিদফতরের কোনো মালিকানা বা শেয়ার ছিল না।
শুরুর দিকে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তানভীর আহমেদের পাশাপাশি কাজী মনিরুল কবিরসহ কয়েকজন উদ্যোক্তা থাকলেও পরে এতে যুক্ত হন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা। ক্ষমতাসীন দলের সাবেক দুই সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক ও রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ‘ব্লু ওয়াটার হোল্ডিং’-এর মাধ্যমে নগদের মালিকানায় অংশীদার হন।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির প্রতিনিধিরাও পরিচালক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ পাচারের সন্দেহ প্রকাশ করে। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধরে কোনো চূড়ান্ত লাইসেন্স ছাড়াই নয়বার সাময়িক অনুমোদনের মেয়াদ বাড়িয়ে কার্যক্রম চালিয়েছে নগদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বলা হয়, ৪১টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার অন্তত ১ হাজার ৭১১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে নগদের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুক ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এই অর্থ দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল।
২০২১ সালে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের অজুহাতে হাজার হাজার গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় নগদ। অভিযোগ রয়েছে, এতে প্রায় ১৪৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্যান্ডেলস্টোন ইনভেস্টমেন্টস ও সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার হস্তান্তরের সময় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পাচারের সন্দেহ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডভিত্তিক ‘মিরেস হোল্ডিংস লিমিটেড’-এর অনুকূলে শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়টিও অনুসন্ধানে রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডাক বিভাগকে বিভ্রান্ত করতে ‘ম্যানিপুলেটেড রিপোর্টিং পোর্টাল’ তৈরি করেছিল নগদ। এ পোর্টাল থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যে ই-মানি তথ্য দেওয়া হতো, তার সঙ্গে নগদের মূল ডাটাবেজের কোনো মিল ছিল না। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজর এড়াতেই এই সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘নগদ দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। তাই গ্রাহকের স্বার্থ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেই সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। নগদকে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করপোরেট কাঠামোর আওতায় আনতে কাজ চলছে।’
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) রেহান আসিফ আসাদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
নগদের হেড অব মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘নগদে গ্রাহকের অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ। নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা সবসময় সতর্ক রয়েছি এবং প্রযুক্তিগত হালনাগাদের মাধ্যমে গ্রাহকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নগদ বর্তমানে নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভর করেই পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি পরিচালন দক্ষতা বজায় রেখেই আমরা কার্যক্রম চালাচ্ছি। আপাতত কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন নেই।’
নতুন কোনো বড় বিনিয়োগকারী বা শিল্পগোষ্ঠী যুক্ত হলে নগদ আবার শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নগদ এখনও দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলে আমরা মনে করি। অন্য কোনো শিল্পগোষ্ঠীর যুক্ত হওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। এ বিষয়ে বর্তমান প্রশাসনের মন্তব্য করার সুযোগ নেই।’
দেবীদ্বারে ১৫০ জনের বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা, ৩০ রোগীকে ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে প্রেরণ

কুমিল্লার দেবীদ্বারে সুবিধাবঞ্চিত ও অসচ্ছল মানুষের দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষা এবং চক্ষুরোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ আয়োজনে প্রায় ১৫০ জন চক্ষুরোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ছানি আক্রান্ত ৩০ জন রোগীকে অস্ত্রোপচারের জন্য নিজস্ব পরিবহনে কুমিল্লা চক্ষু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের হাইলাইটস
- 👁️ দেবীদ্বারের বাকসার উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা শিবির।
- 💊 প্রায় ১৫০ জন চক্ষুরোগীকে বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।
- 🏥 ছানি আক্রান্ত ৩০ জন রোগীকে বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের জন্য কুমিল্লা চক্ষু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
- 🤝 বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতি, কুমিল্লা চক্ষু হাসপাতাল এবং সমাজসেবক মো. আবুল কালাম আজাদের সহযোগিতায় কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।
- 🌿 সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় ৯ নম্বর গুনাইঘর ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে এ ধরনের চক্ষু চিকিৎসা শিবির পর্যায়ক্রমে আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন আয়োজক।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেবীদ্বার উপজেলার বাকসার উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা শিবির অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতি, কুমিল্লা চক্ষু হাসপাতালের আয়োজনে এবং বিশিষ্ট সমাজসেবক ও দেবীদ্বার গ্রীণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মো. আবুল কালাম আজাদের সহযোগিতায় এ চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজি (বিআইসিও) এবং কুমিল্লা চক্ষু হাসপাতালের অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রোগীদের চোখ পরীক্ষা, ছানি রোগী শনাক্তকরণ, বিনামূল্যে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি যাদের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল, তাদের মধ্যে ৩০ জনকে বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের জন্য কুমিল্লা চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চিকিৎসা কার্যক্রমে অংশ নেন ডা. মো. রায়হান মাহমুদ আশিক, শাহাদাৎ হোসেন, সমীর রঞ্জন দাস, আব্দুর রায়হান, আব্দুল হান্নান, মো. আবির ও দুলাল মিয়াসহ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন কর্মসূচির প্রোগ্রাম অফিসার মো. শাহজাহান।
আয়োজক ও সমাজসেবক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, এলাকার অসচ্ছল ও বয়স্ক মানুষের অনেকেই অর্থাভাবে চোখের চিকিৎসা করাতে পারেন না। তাদের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ৯ নম্বর গুনাইঘর ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা শিবির আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি গ্রামে কুমিল্লা চক্ষু হাসপাতালের সহযোগিতায় সফলভাবে এ ধরনের চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, যা ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে।
৪০ দিন বন্ধ উৎপাদন
গ্যাস সংকটে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার

গ্যাস সংকটের কারণে চলতি অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি দেশের বৃহত্তম ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা। টানা ৪০ দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কম সার উৎপাদন হয়েছে বলে জানিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদনের হাইলাইটস
- গ্যাস সংকটে টানা ৪০ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা।
- ৮.৫০ লাখ মেট্রিক টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৭,৬৪,৫৩৫ মেট্রিক টন।
- লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কম উৎপাদিত হয়েছে।
- ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯.৪০ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদনের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে গ্যাসের সংকটের কারণে দীর্ঘ ৪০ দিন উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অর্থবছর শেষে মোট উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফখরুল ইসলাম।
তিনি জানান, পরিবেশবান্ধব এই আধুনিক কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন এবং বছরে প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জিত হলেও চলতি অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উৎপাদন কমে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টনে নেমে আসে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কম উৎপাদিত হয়েছে।
তবে এ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, এমনকি অতিক্রম করাও সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, উৎপাদন শুরুর প্রথম বছরেই ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি মালিকানাধীন পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে এটিই ছিল একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান।
এর আগে দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা দৈনিক ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষম ঘোড়াশাল সার কারখানা এবং ৩০০ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষম পলাশ সার কারখানা ভেঙে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একীভূত ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণ করা হয়।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)-এর অধীনে প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত কারখানাটির উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। পরে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ বাণিজ্যিকভাবে ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন, যা দেশের সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বন্যপ্রাণী সেবার উদ্ধার অভিযান
চা পাতা তুলতে গিয়ে অজগর, শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে আতঙ্ক

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার একটি চা বাগানে চা পাতা সংগ্রহের সময় একটি অজগর সাপ দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শ্রমিকরা। নিরাপত্তার স্বার্থে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে সরে যান। পরে বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাপটি উদ্ধার করেন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) সংলগ্ন ভুরভুরিয়া চা বাগানের সেক্টর-৯ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রমিকরা নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে চা পাতা সংগ্রহ করছিলেন। এ সময় ঝোপের মধ্যে একটি বড় আকৃতির অজগর সাপ দেখতে পেয়ে তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা দ্রুত কাজ বন্ধ করে বাগান কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান।
খবর পেয়ে চা বাগানের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপদে অজগর সাপটি উদ্ধার করেন।
উদ্ধারকৃত অজগরটি পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জানান, বন্যপ্রাণী দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

























