“শাহিনা একজন যোদ্ধা”—সাংবাদিক এবিএম বাশার
মায়ের ভালোবাসা কতটা গভীর হলে পাহাড়সম কষ্টও নীরবে বয়ে নেওয়া যায়, তার জীবন্ত উদাহরণ মোসাম্মৎ শাহিনা আক্তার। স্বামী হারানোর পর দুই শিশুসন্তানকে আঁকড়ে ধরে একাই লড়েছেন জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। অশ্রু, অভাব আর অপমানকে সঙ্গী করেও তিনি হার মানেননি।
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার আলীনগর গ্রামের শাহিনা আক্তার সাত বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়।
স্বামী মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে নতুন সংসার শুরু করেছিলেন স্বপ্ন নিয়েই। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় ২০০০ সালের ৩০ এপ্রিল। তখন শাহিনা গর্ভে ধারণ করছেন ছোট ছেলেকে। অভিযোগ রয়েছে, স্বামীকে তারই স্বজনরা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ঘরের ভেতর ঝুলিয়ে রাখে। সেই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় শাহিনার জীবনযুদ্ধ।
দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে পথে পথে ঘুরেছেন তিনি। বিচার চেয়েছেন, সাহায্য চেয়েছেন, কিন্তু পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। জীবিকার তাগিদে মানুষের বাসায় কাজ করেছেন, সেলাই মেশিন চালিয়েছেন, অন্যের ঘর পরিষ্কার করেছেন। সব কষ্ট সহ্য করেছেন শুধু সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।
পরবর্তীতে দেবীদ্বার পৌরসভায় মাস্টার রুলে প্রায় ১৯ বছর চাকরি করেন শাহিনা। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত এক সচিবের কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সেই চাকরিটিও হারাতে হয় তাকে। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি হারানোর পর পাওনা অর্থও বুঝে পাননি তিনি।
তবুও থেমে যাননি এই সংগ্রামী নারী। ধার-দেনা করে বড় ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। ছোট ছেলে সাইফুল এখন অনার্সে পড়াশোনা করছেন এবং ইউটিউবের মাধ্যমে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলছেন। সন্তানদের এই অবস্থানে পৌঁছে দিতে নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছেন শাহিনা।
দেবীদ্বার উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার বলেন, “শাহিনা একজন সাহসী মা ও সত্যিকারের যোদ্ধা। আমি ব্যক্তিগতভাবে বহুবার তার জন্য লিখেছি, আবেদন করেছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা করতে না পারার কষ্ট আজও রয়ে গেছে। মা দিবসে তাকে আমার স্যালুট।”
মায়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ছেলে সাইফুল। তিনি বলেন, “আমার মা-ই আমার পৃথিবী। তিনি না থাকলে আমি আজ কিছুই হতে পারতাম না।”
এ বিষয়ে ধর্মমন্ত্রী আলহাজ কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ বলেন, “শাহিনা আক্তারের বিষয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেব। তার প্রতি কোনো অন্যায় হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও দেবীদ্বারের ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হবে।”
মা দিবসে নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে শাহিনা আক্তার বলেন, “আমার সন্তানরা একদম ছোট থাকতেই আমি স্বামী হারাই। এরপর শুধু মা নয়, বাবার দায়িত্বও আমাকে পালন করতে হয়েছে। অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন কখনো ছাড়িনি।”
সমাজের অসংখ্য নির্যাতিত ও সংগ্রামী নারীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন শাহিনা আক্তার। তার জীবন কেবল এক মায়ের গল্প নয়, এটি সাহস, আত্মত্যাগ ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী