এমপি মোশারফ হোসেনের উদ্যোগে বন্দিদশার অবসান, স্বজনদের মাঝে স্বস্তি
অবশেষে দীর্ঘ ১৭ মাসের অপেক্ষার অবসান। জীবিকার সন্ধানে দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে আটক হওয়া বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার ২৮ শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। তাঁদের প্রত্যাবর্তনে স্বস্তি ও আনন্দ ফিরে এসেছে পরিবারগুলোর মাঝে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা এবং প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার অবসান হওয়ায় এলাকায়ও বিরাজ করছে স্বস্তির আবহ।
গত ২৭ মে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ফেরেন এসব শ্রমিক। দেশে ফেরার পর তাঁরা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ পেয়েছেন।
দেশে ফেরা শ্রমিকরা বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের কহুলী, দোহার, তেঘরী ও দাসগ্রাম এবং ভাটগ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কহুলী গ্রামের রানা আহমেদ (৩০), আতিকুল ইসলাম (২৮), ফারুক হোসেন (৩০), ফিরোজ হোসেন (২১) এবং তেঘরী গ্রামের সেলিম হোসেন (২৭)সহ আরও অনেকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উন্নত আয়ের আশায় কয়েক বছর আগে এসব শ্রমিক দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তারা আটক হন।
পরে ভারতের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের আটক করে তামিলনাড়ুর চেন্নাই শহরের পুঝাল কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। সেখানে প্রায় ১৪ মাস কারাভোগ করতে হয় তাদের। কারামুক্তির পরও দেশে ফেরার অনুমতি না পাওয়ায় আরও প্রায় তিন মাস একটি বিশেষ কেন্দ্রে থাকতে হয়। সবমিলিয়ে প্রায় ১৭ মাস ধরে তারা বন্দি ও অনিশ্চিত জীবন কাটিয়েছেন।
স্বজনরা জানান, এত দীর্ঘ সময় প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে পরিবারগুলো চরম মানসিক কষ্টের মধ্যে ছিল। অনেক পরিবার আর্থিক সংকটেও পড়েছিল। দেশে ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবারগুলোর মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে।
জানা গেছে, ভারতে আটক শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য এবং বগুড়া জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মোশারফ হোসেন উদ্যোগ নেন। গত ৪ এপ্রিল তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেন। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ মে শ্রমিকরা বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
শনিবার সকালে দেশে ফেরা শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন সংসদ সদস্য আলহাজ মোশারফ হোসেন। এ সময় তিনি তাঁদের দীর্ঘ বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা, কষ্ট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শোনেন এবং পরিবারের খোঁজখবর নেন।
দেশে ফেরা শ্রমিক রাজু আহমেদ বলেন, “আমরা ১৭ মাস অনেক কষ্ট করেছি। কারাগার ও বন্দি জীবনের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দেশে ফিরতে পারব কি না, সেই আশাও অনেক সময় হারিয়ে ফেলেছিলাম। এমপি মহোদয়ের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় আমরা দেশে ফিরতে পেরে খুবই খুশি।”
বুড়ইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এসব শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। অবশেষে তাঁরা দেশে ফিরতে পেরেছেন, এটি আনন্দের খবর। একই সঙ্গে এটি সবার জন্য একটি শিক্ষা। দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এই ঘটনা তার বড় উদাহরণ।”
নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আরা বলেন, “এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। সবাইকে সচেতন হতে হবে, যেন কেউ দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদেশে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকির মধ্যে না ফেলেন।”
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য আলহাজ মোশারফ হোসেন বলেন, “ঈদুল আজহার আগেই ভারতে আটক শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কাছে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পেরেছি। মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোই আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য।”
তিনি এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এই ঘটনা শুধু ২৮ জন শ্রমিকের দেশে ফেরার গল্প নয়; বরং অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতির একটি বাস্তব উদাহরণ। তাই কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশ যেতে হলে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার বিকল্প নেই।

নাজমল হুদা, নন্দীগ্রাম (বগুড়া) থেকে :