প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বদরখালী হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে যুবকের মৃত্যু, নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি পরিবারের

বদরখালী জেনারেল হাসপাতাল
আলফাজ মামুন নুরী, চকরিয়া (কক্সবাজার) থেকে :

চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, সব অভিযোগ অস্বীকার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বদরখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগে এক যুবকের মৃত্যুকে ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত ফাহিম নামের ওই তরুণের পরিবারের দাবি, সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেওয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় এলাকায় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় নিহতের পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২ জুন সকালে চট্টগ্রাম যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন ফাহিম। পথে বদরখালী কলেজ গেট এলাকায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে কোনোভাবে বাড়িতে ফিরলেও তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে তিনি পায়ে শক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে পড়েন। পরে স্বজনরা দ্রুত তাকে বদরখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে নেওয়ার পর রোগীর বারবার পড়ে যাওয়া, চলাফেরায় অক্ষমতা এবং শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির বিষয়টি কর্তব্যরত চিকিৎসককে জানানো হলেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। তাদের দাবি, রোগীর প্রকৃত শারীরিক সমস্যার কারণ অনুসন্ধান না করে দীর্ঘ সময় স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়।

স্বজনদের ভাষ্যমতে, প্রথম স্যালাইন শেষ হওয়ার পর ফাহিম তীব্র মাথাব্যথা, বমি ও অস্বাভাবিক শারীরিক অস্বস্তির কথা জানান। এ সময় পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি রোগীকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ না করে নার্সদের মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, রোগীর মধ্যে স্ট্রোক বা জটিল স্নায়বিক সমস্যার লক্ষণ দেখা গেলেও তাদের সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। একইসঙ্গে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়নি। ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

স্বজনদের অভিযোগ, অবস্থার অবনতি ঘটতে ঘটতে বিকেলের দিকে হাসপাতালেই ফাহিমের মৃত্যু হয়। পরে দায়িত্ব এড়ানোর জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। এছাড়া চিকিৎসা-সংক্রান্ত কিছু নথিপত্র ও প্রেসক্রিপশনে পরিবর্তন আনার চেষ্টার অভিযোগও তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. রাকিব। তিনি বলেন, রোগীকে হাসপাতালে আনার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসা নথিপত্রে কোনো ধরনের কারসাজি বা তথ্য গোপনের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অবহেলা করা হয়নি এবং রোগীর অবস্থা বিবেচনায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সচেতন মহল, মানবাধিকারকর্মী এবং এলাকাবাসীর একাংশ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসা নথি, কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নিহতের পরিবার কক্সবাজারের সিভিল সার্জন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তারা বলছেন, তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগের বাস্তবতা স্পষ্ট হবে।

তবে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এ ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রিন্ট করুন