‘পদত্যাগের সুযোগ পাইনি, টুঙ্গিপাড়ায় যেতে চেয়েছিলাম’ : নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা
ভারতের প্রভাবশালী বাংলা সংবাদমাধ্যম এই সময়-কে দেওয়া এক দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকারে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নয়াদিল্লি থেকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, আকস্মিক উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ পাননি এবং তাঁর পরিকল্পনা ছিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাওয়ার।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ৫ আগস্ট গণভবন ছাড়ার সময় তিনি জানতেন না যে দেশত্যাগ করতে হবে। তাঁর ভাষায়, “আমাকে পদত্যাগ করার সময় দেওয়া হয়নি। আমি ভেবেছিলাম টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাব, কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সুযোগও তিনি পাননি। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সময়ের স্বল্পতার কারণে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
শেখ হাসিনার ভাষ্যমতে, গণভবনের দিকে মিছিল এগিয়ে আসার সময় তাঁর হাতে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় ছিল। তিনি বলেন, “আমার কাছে কোনো প্রস্তুত পদত্যাগপত্র ছিল না। আমি কোনো কাগজে স্বাক্ষরও করিনি।”
সাক্ষাৎকারে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি পরিকল্পিত ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর অংশ। তাঁর অভিযোগ, বিদেশি একটি শক্তি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে ক্ষমতার পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করিনি। সেন্ট মার্টিন লিজ দেওয়ার বিষয়ে রাজি না হওয়ায় আমাকে নানা চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।”
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একসময় সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “আমি আমার কর্মীদের ফেলে বিশ্রামে যেতে পারি না। সময় হলে দেশের মানুষের কাছে অবশ্যই ফিরে যাব।”
সাক্ষাৎকারে ৫ আগস্ট গণভবনে সংঘটিত ঘটনাকে শেখ হাসিনা তাঁর ও বোন শেখ রেহানার জীবনের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, ওইদিনের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সেটিকে তিনি হত্যাচেষ্টার অংশ হিসেবেই দেখেন।
ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের অবসর সংক্রান্ত পূর্ববর্তী বক্তব্যের প্রসঙ্গেও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন মন্তব্য করা হলেও বর্তমান বাস্তবতায় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
উল্লেখ্য, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান নেওয়ার পর এটাই শেখ হাসিনার সবচেয়ে বিস্তারিত ও বিস্তৃত সাক্ষাৎকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর সাম্প্রতিক এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী, সম্পাদক :