প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

দেবীদ্বারে ৩৮ ক্যান্সার রোগীর পাশে মানবিক উদ্যোগ, আর্থিক সহায়তা ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ

দেবীদ্বারে ক্যান্সার রোগীদের সহায়তা
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক :

‘ক্যান্সার রোগীদের প্রয়োজন মানসিক শক্তি ও সামাজিক সহায়তা’
— চেয়ারম্যান, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড

কুমিল্লার দেবীদ্বারে ক্যান্সারে আক্রান্ত অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছে একটি ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ। চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে দিশেহারা ৩৮ জন ক্যান্সার রোগীর মাঝে নগদ আর্থিক সহায়তা, ঔষধি গাছের চারা ও বিভিন্ন ফল-সবজির বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

শুক্রবার (১২ জুন) বিকেল ৩টায় দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজ মিলনায়তনে “Raise Your Hands for Needy Cancer Patients” গ্রুপের উদ্যোগে এবং “দেবীদ্বার উপজেলা জনকল্যাণ সংঘ”-এর সহযোগিতায় এ সহায়তা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আহসান পারভেজ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “ক্যান্সার রোগীদের শুধু ওষুধ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাদের প্রয়োজন মানসিক সাহস, সামাজিক সমর্থন এবং আশাবাদী পরিবেশ। ক্যান্সার মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং এটি একটি কঠিন লড়াই, যেখানে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি আরও বলেন, “একজন ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে। তাই এই ধরনের মানবিক উদ্যোগ শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, রোগীদের নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়। আপনারা নিজেদের রোগী নয়, যোদ্ধা হিসেবে ভাবুন। তাহলেই এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার শক্তি পাবেন।”

ঢাকা বাংলা সরকারি কলেজের অধ্যাপক ড. জেসমিন পারভীন সিমা-এর সভাপতিত্বে এবং মো. সফিউল্লাহ সোহাগ-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বরুণ চন্দ্র দে, বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবক মো. আনোয়ার হোসেন ভুলু পাঠান, দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, সমাজসেবক মো. মোজাফ্ফর আহমেদ, দেবীদ্বার মফিজ উদ্দিন আহমেদ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, সাংবাদিক সৈয়দ খলিলুর রহমান বাবুল এবং ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী মো. শাহ আলম।

অনুষ্ঠানে ক্যান্সার প্রতিরোধ, সচেতনতা ও চিকিৎসা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান করেন ডা. মো. আল আমিন এবং ডা. মো. সাহেদ কামাল।

এদিন গলা, ফুসফুস, স্তন, জরায়ু, রক্ত ও মস্তিষ্কের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত ৩৮ জন রোগীর প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক বিভিন্ন ভেষজ ও ঔষধি গাছের চারা এবং ফল ও সবজির বীজ বিতরণ করা হয়।

আয়োজকরা জানান, রোগীদের সুস্থ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি পরিবারগুলোকে কিছুটা হলেও আর্থিক স্বস্তি দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ঔষধি গাছগুলোর পরিচর্যা ও ব্যবহার সম্পর্কেও রোগীদের বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

সহায়তা পাওয়া এক ক্যান্সার রোগীর স্বজন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আমরা প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। এমন কঠিন সময়ে কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবে, তা কল্পনাও করিনি। এই সহায়তা আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।”

সভাপতির বক্তব্যে ড. জেসমিন পারভীন সিমা বলেন, “আমি নিজেও একজন ক্যান্সারজয়ী মানুষ। তাই এই রোগের কষ্ট এবং রোগী-পরিবারের সংগ্রাম আমি খুব কাছ থেকে বুঝি। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা এবং তাদের লড়াইয়ে অংশ নিতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।”

তিনি আরও বলেন, “সমাজের সামর্থ্যবান মানুষরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসেন, তাহলে কোনো ক্যান্সার রোগী নিজেকে অসহায় বা একা মনে করবেন না।”

অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত রোগী ও তাদের স্বজনদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও মিলনায়তনজুড়ে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও আশার এক অনন্য আবহ বিরাজ করে। এই উদ্যোগ দেবীদ্বারের অসহায় ক্যান্সার রোগীদের মাঝে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন ও সাহস জোগাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন

ক্যান্সার হলো শরীরের কোষের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলেও সচেতনতা, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসার কারণে অনেক ধরনের ক্যান্সার সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় করা সম্ভব হচ্ছে। তামাক সেবন, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, পরিবেশ দূষণ এবং বংশগত কারণ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ক্যান্সার প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সাহস, পারিবারিক সহযোগিতা এবং সামাজিক সমর্থনও সমানভাবে প্রয়োজন। কারণ আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মনোভাব অনেক ক্ষেত্রে রোগীর সুস্থতার পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

প্রিন্ট করুন