মব জাস্টিসের আড়ালে কার্যালয় দখল ও ঢালাও মামলায় রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ: গভীর সংকটে মানবাধিকার
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে মব জাস্টিস বা গণ-উন্মাদনার আড়ালে রাজনৈতিক কার্যালয় দখল এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই ঢালাও মামলার অভিযোগ দিন দিন জোরালো হচ্ছে। বিগত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলার কার্যালয় ভাঙচুর ও বেআইনিভাবে দখলের পর এবার যোগ হয়েছে নির্বিচার মামলা ও আইনি হয়রানির সংস্কৃতি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বহু মানুষ কেবল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কোনো রকম প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই হত্যাসহ গুরুতর অপরাধের মামলার আসামি হচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আইনের শাসনের এই দুর্বলতা পুরো বিচারব্যবস্থাকে এক চরম আস্থার সংকটে ফেলছে।
মব জাস্টিস ও দলীয় কার্যালয় দখলের নতুন চিত্র
- অবৈধ দখলদারিত্ব: গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো ভাঙচুর করে অন্য ব্যানারে বা দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
- আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া: আইনের তোয়াক্কা না করে একদল উগ্রপন্থী মব জাস্টিসের নামে ভীতি তৈরি করে সম্পদ ও স্থাপনা দখল করছে, যা সাধারণ নাগরিক ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
‘মামলা বাণিজ্য’ ও ঢালাও এজাহার
- নাম ঢুকিয়ে চাঁদাবাজি: দেশের বিভিন্ন থানায় একই মামলায় শত শত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিসহ সিনিয়র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং সাংবাদিকদের আসামি করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, এই মামলাগুলোকে এক শ্রেণির অসাধু চক্র আর্থিক চাঁদাবাজি বা নাম কাটার ‘ব্যবসায়’ রূপান্তর করেছে।
- তদন্তহীন গ্রেফতার: সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ ছাড়াই শুধু এজাহারে নাম থাকার কারণে গণহারে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এতে করে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে আর নিরপরাধ রাজনৈতিক কর্মীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ
- জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টির সতর্কতা: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসংঘ ইতিমধ্যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইন ও বিচার ব্যবস্থার ব্যবহার (Politically Motivated Prosecutions) নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
- ন্যায্য বিচারের অধিকার খর্ব: আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বাধা দেওয়া, জামিন প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখা এবং মবের প্রভাবে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়েও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই মব জাস্টিস এবং প্রতিহিংসামূলক মামলার প্রবণতা দ্রুত বন্ধ করা না যায়, তবে এটি ভবিষ্যতে যে কোনো শাসনব্যবস্থার জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। আইনের শাসন পুনরুজ্জীবিত করতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কেবল প্রকৃত অপরাধীদেরই বিচারের আওতায় আনা জরুরি।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী, সম্পাদক :