
একটা সময় ছিল, যখন মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয় হতো গ্রামের মেঠোপথে, স্কুলের বেঞ্চে কিংবা কোনো আত্মীয়ের বাড়ির উঠানে। এখন সময় বদলেছে। পরিচয়ের দরজা খুলে যায় একটি নোটিফিকেশন থেকে, একটি মেসেজ থেকে, কখনো কখনো মাত্র দুটি শব্দ থেকেও।
আমার ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছিল।
ঘটনাটা খুব সাধারণ। অথচ কেন জানি না, আমার কাছে এটি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি কিছু হয়ে উঠেছে।
অনেকদিন ধরে আমার একটি পুরোনো ফেসবুক আইডি প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে ছিল। সেখানে আমি খুব একটা যাই না। মাঝে মাঝে লগইন করে পুরোনো কিছু স্মৃতি দেখি, পরিচিত কারও খোঁজ নিই, তারপর আবার হারিয়ে যাই নিজের ব্যস্ততায়।
সেদিনও ঠিক তেমনভাবেই ঢুকেছিলাম।
নোটিফিকেশন ঘাঁটতে ঘাঁটতে মেসেঞ্জারে একটি অপঠিত বার্তা চোখে পড়ল। প্রেরকের নাম—সেলিনা।
বার্তাটি খুব ছোট।
“প্রিয় মোহাম্মদ শরিফুল আলম!”
মাত্র তিনটি শব্দ।
কিন্তু এই তিনটি শব্দই আমার মনে এক ধরনের কৌতূহল তৈরি করল।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, ভুয়া পরিচয় আর অসংখ্য ফেক আইডির ভিড়ে এমন মেসেজ দেখলে সন্দেহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। মনে হয়েছিল হয়তো কোনো ভুয়া অ্যাকাউন্ট। হয়তো কোনো উদ্দেশ্য আছে। তাই মেসেজটি দেখেও উত্তর দিইনি।
দিন কয়েক পর আবার মেসেজটি চোখে পড়ল।
মনের ভেতরে তখন অন্যরকম একটি প্রশ্ন জাগল।
যদি মানুষটি সত্যিই বাস্তব হন?
যদি তিনি কোনো প্রয়োজনেই যোগাযোগ করতে চান?
সন্দেহ আর কৌতূহলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত উত্তর দিলাম।
“কে আপনি?”
প্রশ্নটা পাঠিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
একদিন গেল, দুদিন গেল।
নীরবতা।
আমি তখন আমার বাস্তব ফেসবুক আইডির লিংক এবং হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়ে লিখে রাখলাম, প্রয়োজন হলে যেন সেখানে যোগাযোগ করেন।
তারপরও কোনো সাড়া নেই।
অবশেষে কিছুটা মজা করেই আবার লিখলাম—
“কিতাগো ভাই, আপনি যে আপনার পরিচয় দিলেন না!”
এবার উত্তর এল।
ছোট্ট একটি বার্তা।
“আমি মোস্ট সেলিনা আক্তার। আমি ঢাকায় থাকি। একটা মেডিকেলে চাকরি করি।”
এরপর আরেকটি মেসেজ।
“আপনাকে চিনি না। ফেসবুকে দেখেছি তাই নক দিয়েছিলাম অ্যাড হওয়ার জন্য।”
আরেকটি।
“আপনি কেমন আছেন? কোথায় থাকেন?”
এই ছিল পরিচয়ের শুরু।
কোনো নাটকীয়তা ছিল না।
কোনো প্রেমের গল্পও নয়।
ছিল শুধু দুইজন অপরিচিত মানুষের ভদ্র ও সাধারণ কথোপকথন।
কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম, সেলিনার বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলায়। বর্তমানে তিনি ঢাকায় থাকেন এবং একটি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন।
মানুষকে সাহায্য করাই যেন তার পেশা এবং নেশা।
আমি মজা করে বলেছিলাম, “তাহলে আমার চিকিৎসার দায়িত্বও আপনাকেই নিতে হবে।”
তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,
“আপনি শুধু বলবেন, আপনাকে কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি।”
এই একটি বাক্য আমাকে অদ্ভুতভাবে স্পর্শ করেছিল।
কারণ পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, যারা কথা বলে।
কিন্তু খুব কম মানুষ আছে, যারা সাহায্যের কথা বলে।
এরপর ধীরে ধীরে কথোপকথনের পরিধি বাড়তে লাগল।
একসময় তিনি তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরও দিলেন।
সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন এক বন্ধুত্বের যাত্রা।
বন্ধুত্ব—শব্দটি যত সহজ, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন।
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে।
সত্যি কথা বলতে কী, আমার জীবনে কোনো নারীর সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব খুব বেশি দিন টেকেনি।
এর জন্য হয়তো আমিই দায়ী।
আমার একরোখা স্বভাব, স্পষ্টবাদিতা, মুখের ওপর সত্য কথা বলে ফেলার অভ্যাস—সব মিলিয়ে অনেক সম্পর্কই সময়ের আগেই দূরত্বে হারিয়ে গেছে।
অনেকেই এসেছে।
আবার চলে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ যোগাযোগ করেছে।
অনেক সুন্দরী নারীও বিভিন্ন সময় ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েছেন।
কিন্তু আমি সেসবের বেশিরভাগের উত্তরই দিইনি।
কারণ আমি কখনো অযথা কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাইনি।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারিনি।
বিশ্বাস আমার কাছে খুব মূল্যবান একটি বিষয়।
যাকে বিশ্বাস করব, তাকে মন থেকে করতে চাই।
যাকে বন্ধু বলব, তাকে সত্যিকার অর্থেই বন্ধু ভাবতে চাই।
ভান কিংবা অভিনয়ের সম্পর্ক আমার কখনো ভালো লাগেনি।
এই কারণেই হয়তো জীবনের বড় একটা সময় আমি একাই কাটিয়েছি।
আজও আমি একা।
একা থাকতে শিখে গেছি।
একা থাকতেই অভ্যস্ত।
কিন্তু মানুষ যতই বলুক সে একা থাকতে চায়, মনের ভেতরে কোথাও না কোথাও একজন ভালো মানুষের জন্য অপেক্ষা থেকে যায়।
যে বিচার করবে না।
যে স্বার্থ খুঁজবে না।
যে অভিনয় করবে না।
যে শুধু মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াবে।
সেলিনার সঙ্গে পরিচয়ের পর বারবার সেই কথাটাই মনে হয়েছে।
হয়তো মানুষটি সত্যিই ভালো।
হয়তো তিনি অন্যদের মতো নন।
হয়তো এই পরিচয়টুকু শুধু পরিচয় হয়েই থাকবে।
হয়তো সময়ের সঙ্গে হারিয়েও যাবে।
আবার হয়তো টিকে থাকবে বহুদিন।
কে জানে?
ভবিষ্যৎ তো কেউ বলতে পারে না।
তবে এটুকু বলতে পারি, পৃথিবী যতই স্বার্থপর হয়ে উঠুক, মানুষের প্রতি বিশ্বাস পুরোপুরি হারিয়ে ফেলাটা ঠিক নয়।
কারণ কখনো কখনো একটি ছোট্ট বার্তাও মানুষের জীবনে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়।
একটি ‘প্রিয়’ সম্বোধনও নতুন করে মানুষের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
আজ আমার বন্ধু তালিকায় অনেক পরিচিত মানুষ আছেন।
বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন শ্রেণির, বিভিন্ন অবস্থানের মানুষ।
অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী—অনেকেই আছেন।
কিন্তু ব্যক্তিগত অনুভূতির গল্প খুব কম মানুষের সঙ্গেই ভাগাভাগি করেছি।
হয়তো কখনো করিনি।
তবুও এই অচেনা পরিচয়ের গল্পটি লিখতে বসে মনে হলো, মানুষের জীবনে সম্পর্কের সংজ্ঞা আসলে খুব জটিল নয়।
কখনো কখনো একটি আন্তরিক বার্তাই যথেষ্ট।
একটি শুভেচ্ছাই যথেষ্ট।
একটি মানবিক বাক্যই যথেষ্ট।
সেলিনা হয়তো আমার জীবনের কোনো বিশেষ চরিত্র নন।
হয়তো সময়ের স্রোতে তিনি হারিয়ে যাবেন।
হয়তো থেকে যাবেন একজন ভালো বন্ধু হয়ে।
কিন্তু এই পরিচয় আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—
পৃথিবী এখনো পুরোপুরি খারাপ হয়ে যায়নি।
এখনো কোথাও কোথাও কিছু ভালো মানুষ আছেন।
যারা কোনো স্বার্থ ছাড়াই শুধু মানুষকে মানুষ ভেবে কথা বলতে জানেন।
আর সেই কারণেই, একটি পুরোনো ইনঅ্যাকটিভ ফেসবুক আইডিতে আসা একটি ছোট্ট বার্তা আজ আমার কাছে শুধুই একটি মেসেজ নয়—
এটি মানবিকতার প্রতি নতুন করে বিশ্বাস করার একটি গল্প।

