কুমিল্লার অরক্ষিত ৩৪ বধ্যভূমিতে ইতিহাস বিলীন: ধান শুকায়, মাদকসেবীদের আড্ডা বসে শহীদদের গণকবরে
কুমিল্লার অরক্ষিত অবস্থায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অন্তত ৩৪টি বধ্যভূমি, যেখানে কোনো স্মারক নেই, নেই সংরক্ষণের উদ্যোগ। কোথাও চলছে ধান শুকানো, কোথাও চরছে গরু-ছাগল, আবার কিছু স্থানে পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে। ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে।
জেলার মুক্তিযোদ্ধা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় বধ্যভূমির সংখ্যা ৫০টি। এর মধ্যে অন্তত ৩৪টি একেবারেই অরক্ষিত। বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক গণকবরের পাশে কোনো সীমানা নেই, দেখভালের কেউ নেই, এমনকি স্থানীয়রাও জানেন না সেখানে কি ঘটেছিল ১৯৭১ সালে।

আবুল কাশেম হৃদয়ের ‘অপারেশন কিল অ্যান্ড বার্ন’ গ্রন্থে আরও দুটি বধ্যভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়—সদর দক্ষিণের জগতপুর ও লাকসামের চিতোশি খেয়াঘাট। সেগুলোও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। একইভাবে কোটেশ্বর ও কটকবাজারের সম্মুখযুদ্ধের দুটি স্মৃতিস্তম্ভও অযত্নে ধ্বংসের পথে।
সদরের রসুলপুর বধ্যভূমিতে স্থানীয়দের ধান শুকাতে দেখা গেছে। একটি উপড়ে পড়া গাছ এখনও সরানো হয়নি ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের পর থেকে। একজন বাসিন্দা জানান, সেখানে মাদকসেবীদের রাতে আড্ডা বসে। অথচ এ জায়গাতেই ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনী পাঁচ শতাধিক মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করে গণকবর দেয়।
বেঁচে ফেরা জেলার মুরাদনগর উপজেলার কাজিয়াতল গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা অব. সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল মতিন চৌধুরী বলেন, “গণকবরের এই অবস্থা দেখে চোখে পানি চলে আসে। তখন আমরা গুলি চালিয়ে প্রতিরোধ করেছিলাম, কিন্তু অস্ত্র কম থাকায় শেষ করা যায়নি। নিরীহ মানুষদের সারিবদ্ধভাবে হত্যা করার দৃশ্য আজও ভোলা যায় না।”
অন্যদিকে ধনঞ্জয় গ্রামে একটি বাড়ির ভেতর ৩৫ জনকে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়। সেখানে একটি নামমাত্র স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, কিন্তু বছরে একবারও কেউ শ্রদ্ধা জানাতে যান না বলে স্থানীয়রা জানান।
জেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরও যেসব বধ্যভূমি ও গণকবর রয়েছে, তার মধ্যে আছে—রসুলপুর, রামমালা, জগতপুর, বেতিয়ারা, লাকসামের বেলতলী, কৃষ্ণপুর, ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট, হারং ও কোটেশ্বর। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ইতিহাস ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট বধ্যভূমিতে—সেখানে একাধিক গণসমাধি থেকে সাত হাজারের বেশি নরকঙ্কাল উদ্ধার হয়েছিল। এ জায়গাতেই ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে হত্যা করে হানাদার বাহিনী।
লাকসাম রেলওয়ে জংশনের পাশে বধ্যভূমিতে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারায় ৯ জন গেরিলাযোদ্ধাকে হত্যা করে কবর দেয়া হয়, যেটি মহাসড়কের সম্প্রসারণের কারণে স্থানান্তরিত হয়েছে।
রামমালা এলাকায় সার্ভে ইনস্টিটিউটের পুকুরপাড়ে একটি বধ্যভূমি রয়েছে যেখানে ২৫ মার্চের ভোরে আশ্রয় নেয়া মানুষদের গুলি করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউল আহমেদ বলেন, “কিছু বধ্যভূমি চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে, রামমালা সংরক্ষণের কাজ চলমান। সরকারি সহায়তা পেলে সবগুলোতেই সীমারেখা ও সংরক্ষণ সম্ভব।”
জেলা প্রশাসক মো. আমীরুল কায়ছার বলেন, “গণকবর ও বধ্যভূমি সংরক্ষণে যেসব কাজ প্রয়োজন, তা করা হবে।”
তবে বাস্তবতা হলো, কুমিল্লার অরক্ষিত বধ্যভূমিগুলোর চিত্রে স্পষ্ট যে শহীদদের স্মৃতিরক্ষায় দায়িত্বশীল মহলের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস অজানা রয়ে যাচ্ছে, কারণ তা সংরক্ষণ না করলে ইতিহাসের পাতায় শুধু থাকবে নাম—স্থানে থাকবে মাদকসেবীদের পদচারণা।


























