২০২৪ সালের ৫ আগস্টের লুটপাট
সংসদ ভবন থেকে উধাও ১৩৪৩ কপার বার! দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা দায়ী বলছে তদন্ত কমিটি

ফাইল ফটো
রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর একটি জাতীয় সংসদ ভবন। সেই সংসদ ভবনের স্টোররুম থেকেই উধাও ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বাসবার। সরকারি হিসাবে যার মূল্য ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু এ বিপুল পরিমাণ ভারী ধাতব সরঞ্জাম কীভাবে গায়েব হলো, তা জানেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও। কেউ বলছেন স্টোরে ছিল, কেউ বলছেন বুঝে পাননি, আবার কেউ দায় চাপাচ্ছেন অধস্তন কর্মকর্তার ওপর। অথচ কাগজে-কলমে সব ঠিকঠাক।
৭১ কোটি টাকার সাব-স্টেশন উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন সরঞ্জাম ব্যবহারের কথা থাকলেও পরে দেখা যায় পুরোনো কিছু কপার বারই আবার ব্যবহার করা হয়েছে। কাজ শেষে অবশিষ্ট মালপত্র স্টোরে জমা করার কথা বলা হলেও বাস্তবে মিলছে না সেসবের অস্তিত্ব। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—একই কাজের জন্য দুইবার সার্ভে রিপোর্ট তৈরি হয়েছে; কিন্তু দুই রিপোর্টেই অসংগতি লক্ষণীয়। কোথাও স্বাক্ষর নেই, কোথাও তারিখ নেই, আবার কোথাও সরঞ্জামের পরিমাণ ও মূল্য গেছে পাল্টে। প্রতিটি নথিই যেন আরেকটি নথিকে আড়াল করার জন্য তৈরি।
অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ না করেই বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। আর সেই অনিয়ম ঢাকতেই পুরোনো মালপত্র বিক্রি কিংবা গায়েবের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তদন্তের আগেই দায় চাপানো হয়েছে এমন এক উপসহকারী প্রকৌশলীর ওপর, যিনি মাত্র পাঁচ মাস দায়িত্বে ছিলেন; কিন্তু তার দাবি, তাকে কখনোই স্টোর বা প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো জাতীয় সংসদ ভবনের মতো কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থান থেকে এত বিপুল পরিমাণ কপার বার কীভাবে উধাও হলো? এটি কি শুধুই চুরি, নাকি এর আড়ালে আছে আরও বড় কোনো প্রকল্পে দুর্নীতি, যেখানে কোটি কোটি টাকার হিসাব গায়েব হয়ে গেছে নথির আড়ালে?
সংসদ ভবন সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’-এর আওতায় প্রায় ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে সংসদ ভবনের নবম তলায় এবিসিডি সাব-স্টেশনে এলটি ও ইএলটি প্যানেল কেবলের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল কাজ করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এডেক্স করপোরেশন লিমিটেড। চারটি সাব-স্টেশনের মধ্যে শুধু-ডি এর কাজ শেষ হলে ৩৪২টি কপার বাসবার স্টোররুমে জমা করেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী। ৫ আগস্টের পর তাকে বদলি করা হলে দায়িত্বপান মো. আনোয়ার হোসেন; কিন্তু আনোয়র হোসেনের আমলে বাকিগুলো সম্পন্ন হয়েছে বলা হলে পুরোনো কপার পাওয়া যাচ্ছে না।
খোদ গণপূর্তের কর্মকর্তারা সংশয় প্রকাশ করে বলছেন, যেসব কাজ হওয়ার কথা, তা সম্পন্ন হয়েছে নাকি জুলাই আন্দোলনের পর পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে সময়ক্ষেপণে বলা হচ্ছে সম্পূর্ণ কাজ হয়েছে এবং বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে। সামান্য কিছু কাজ হয়েছে; কিন্তু নতুন মালপত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। তাই পুরোনো মালপত্র স্টোরে জমা হয়নি। এত কপারবার চুরি হয় কীভাবে। সম্পূর্ণ কাজ হলে এতদিন এসব সরঞ্জামের খবর ছিল না কেন? জমা দেওয়ার সময় সার্ভে রিপোর্ট হলো না কেন? ৫ আগস্টের পর নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে আসা মো. আনোয়ার হোসেন কাজের টেন্ডার আগে হওয়ায় এবং কিছু হওয়ার পর আর কাজের প্রয়োজন মনে করেননি। বা কিছু কাজের প্রয়োজন হলে পুরোনো ৬৬টি বার ব্যবহার করে সমাধান করা হয়েছে। এখন এসব বিষয়ে সামনে আসায় ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বাসবার নিয়ে কথা হচ্ছে।
জানা গেছে, কপার বার হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়ার বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী কেউই এর দায় নিতে নারাজ। নির্বাহী প্রকৌশলী ও এসডি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ এনে উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনকে বদলি করা হয়েছে। এমনকি উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনকে দায়ী করে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন ও এসডি আসিফ রহমান নাহিদ।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে হেলাল উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, এ কাজের দায়িত্বে মাত্র পাঁচ মাসের মতো ছিলাম। অন্যদিকে দীর্ঘ তিন বছর সংসদ ভবনের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করছেন আসিফ। তিনিই সব কাজ করে থাকেন। কোথায় কী কাজ হয়েছে ও কাজ চলমান আছে—এসব বিষয়ে কিছুই আমাকে জানানো হয়নি। বারবার বলার পর আমাকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এমনকি এ কাজের সাইটে কোনোদিন যাওয়ার সুযোগ দেয়নি। যে পরিমাণ পুরোনো কপার বার স্টোরে সংরক্ষিত ছিল বলা হচ্ছে, তার আমি কিছুই জানি না। এবং আমাকে কখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
এরপর গত ২৫ মার্চ চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এ তদন্ত কমিটি সংসদ ভবন থেকে কপার বার উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য বলছে, আমব্রেলা প্রজেক্টের আওতায় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল, নিরাপত্তা ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। এর মধ্যে ছিল সংসদ ভবনের নবম তলায় বিদ্যমান চারটি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশনের জন্য এলটি সুইচগিয়ার, বাসবার ট্রাঙ্কিং এবং নতুন জিআইএস প্যানেল সরবরাহ ও স্থাপন কাজ। টেন্ডার নং: ০৫৪(১৩) E/M-৭/, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই কাজ দেখানো হয়। দুটি ছিল ২০২০-২১ অর্থবছরের, যার আইডি নং ৫২৬২৩২ ও ৫৩৫৫৩৩। এ ছাড়া আরেকটি কাজের অর্থবছর উল্লেখ করা হয় ২০২২-২৩, যার আইডি নং ৭৮৩৪৬৬। এসব কাজ করেছে এডেক্স করপোরেশন লিমিটেড। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর কাজগুলো চলমান বলে উল্লেখ করা হয়। এসব কাজ শেষে পুরোনো ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বার স্টোরে সংরক্ষণ করা আছে বলে দাবি করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা।
জানা গেছে, সংসদ ভবনের সাব-স্টেশন চারটির কাজ পায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এডেক্স করপোরেশন লিমিটেড। কিছু কাজ কম হওয়ায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের কমিশন চান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন; কিন্তু সেই কমিশন না দেওয়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল কম দেওয়া হয়। নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সঙ্গে এ নিয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
নথির তথ্যমতে, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি স্টোররুম পরিদর্শন করেন সংসদ ভবনের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন। এরপর একটি চিঠি তৈরি করা হয়। তাতে বলা হয়, এডেক্স করপোরেশন সম্পাদিত লেভেল ১০৮-এ নবম তলার বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র এ, বি, সি, ডি-এর কাজ শেষে পুরোনো এলটি, এইচটি প্যানেল থেকে ১৪০৯টি কপার বার পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৬টি কপার বার টাই বাসবারে ব্যবহারের পর ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বার উপসহকারী প্রকৌশলী, শাখা-২-এর তত্ত্বাবধানে থাকা এমএমপি রুমের স্টোরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু গত ২১ জানুয়ারি উপসহকারী প্রকৌশলী শাখা-২ এবং ইলেকট্রিশিয়ানসহ সার্ভে রিপোর্ট প্রস্তুতের জন্য স্টোরগুলো পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বারের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক কপার বার জমা রয়েছে। কিন্তু স্টোররুম পরিদর্শন করলে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজে স্বাক্ষর না করে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ দিয়ে স্বাক্ষর করান, এবং চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি চিঠি ইস্যু করান। আবার একই তারিখে দ্বিতীয়বার সার্ভে রিপোর্ট দেখানো হয়।
প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য বলছে, এডেক্স করপোরেশনের কাজ শেষে অকেজো মালপত্র স্টোররুমে জমা দেখিয়ে প্রথমে একটি সার্ভে রিপোর্ট করা হয় দুই বছর পর (গত বছর ১৮ ডিসেম্বর)। এ সার্ভে রিপোর্ট সংসদ ভবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ রিসিভ করেন। কিন্তু তিনি স্বাক্ষর করেননি। আগের রিপোর্টের সঙ্গে কোনো মিল নেই। দুটি সার্ভে রিপোর্ট দেখানো হলেও প্রথমটিতে কোনো তারিখ ও স্বাক্ষর নেই। এমনকি প্রথমবারের সার্ভে রিপোর্ট কম্পিউটারে টাইপ করা হলেও তাতে কিছু মালপত্রের তথ্য হাতেও লেখা আছে। দ্বিতীয়বার সার্ভে রিপোর্ট করা হয় চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি। তাতে দেখা যায়, প্রথমবারের সার্ভে রিপোর্টে যেসব মালপত্রের কথা উল্লেখ করা হয়, তার সঙ্গে মিল নেই। কারণ, কাজ একই হলেও দ্বিতীয় সার্ভে রিপোর্টে মালপত্রের কথা বেশি উল্লেখ এবং অধিক মূল্য ধরা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথমবারের সার্ভে রিপোর্টে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের স্বাক্ষর না থাকলেও দ্বিতীয় সার্ভে রিপোর্টে তার স্বাক্ষর রয়েছে। মূলত এ চিঠি তৈরি করা হয় নিজের দায়ভার এড়াতে।
এর আগে গত বছর জুন মাসে স্টোররুমে কপার বারের সংখ্যা উল্লেখ করে একটি চিঠিতে বলা হয়, এডেক্স করপোরেশন লিমিটেড কাজ করে সংসদ ভবনের ১০৮-এ নবম তলার সাব-স্টেশনের কাজ শেষে অবশিষ্ট মারপত্র ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর সাব-ষ্টেশন-বি-এর কাজ শেষে অবশিষ্ট মালপত্র, ৩১ অক্টোবর সাব স্টেশন-সি-এর কাজ শেষে অবশিষ্ট মালপত্র, ১১, ১২ ও ১৩ জুলাই ও ২৬ অক্টোবর এ, বি, সি, ডি-এর কাজ শেষে অবশিষ্ট মালপত্র ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ফেরত প্রদান করা হয়। মালপত্র এমএমপি স্টোরে সংরক্ষিত রয়েছে। দুই বছর আগে কাজ শেষ হলেও দুই বছর পর সার্ভে রিপোর্ট করা হয়, এবং হেলালের আগে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের কেন এ সংরক্ষিত মালপত্র বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গার স্টোররুম কেন সিসিটিভি নষ্ট। এমন নানা প্রশ্ন তুলেছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী নেতারা। মূলত গত বছরের চিঠি দেখানো হলেও সম্প্রতি এ চিঠি তৈরি করে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী নেতারা।
উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ কালবেলাকে বলেন, কিছু বিষয় আছে সেগুলো বলা যায় না। কয়েকজন কর্মচারী ঠিকাদারের সঙ্গে মিলে স্টোরে কপার বারগুলো বিক্রির জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কপার বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল এমন কিছু কথা বলেন, যা সন্দেহজনক।
পুরোনো কপার বাসবার ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরোনো কিছু মালপত্র ব্যবহারের কথা ছিল। ঠিকাদার কোম্পানিকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কম দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আনোয়ার স্যার করেছেন। তার সঙ্গে কী ঝামেলা হয়েছে তিনি জানেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এডেক্স করপোরেশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রকৌশলী নুরুন নবী সুজন কালবেলাকে বলেন, প্রায় সব কাজ শেষ, কিন্তু একটি স্টেশনের লাইন দেওয়া হয়নি। নির্বাহী প্রকৌশলী আমাদের ১ কোটি ৮০ লাখ কম দিয়েছেন। এখনো কিছু বিল বাকি আছে। আমাদের কোম্পানি সম্পূর্ণ কাজ করার পরও টাকা কম দিয়েছে, এ বিষয়ে মামলা করব। কপার বারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব বিষয় জানি না। শুনেছি কপার চুরি হয়েছে।
সংসদ ভবন থেকে কপার বার হারিয়ে বা চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালিকুজ্জামান চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা বলতে পারবেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কি না, যদি দেওয়া হয় তাহলে সংসদ থেকে কপার বার হারিয়ে বা চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রমাণ মিলেছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তর তিনি বলেন, এটা আমি জানি না।
৪০ দিন বন্ধ উৎপাদন
গ্যাস সংকটে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার

গ্যাস সংকটের কারণে চলতি অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি দেশের বৃহত্তম ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা। টানা ৪০ দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কম সার উৎপাদন হয়েছে বলে জানিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদনের হাইলাইটস
- গ্যাস সংকটে টানা ৪০ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা।
- ৮.৫০ লাখ মেট্রিক টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৭,৬৪,৫৩৫ মেট্রিক টন।
- লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কম উৎপাদিত হয়েছে।
- ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯.৪০ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদনের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে গ্যাসের সংকটের কারণে দীর্ঘ ৪০ দিন উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অর্থবছর শেষে মোট উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফখরুল ইসলাম।
তিনি জানান, পরিবেশবান্ধব এই আধুনিক কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন এবং বছরে প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জিত হলেও চলতি অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উৎপাদন কমে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টনে নেমে আসে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কম উৎপাদিত হয়েছে।
তবে এ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, এমনকি অতিক্রম করাও সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, উৎপাদন শুরুর প্রথম বছরেই ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি মালিকানাধীন পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে এটিই ছিল একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান।
এর আগে দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা দৈনিক ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষম ঘোড়াশাল সার কারখানা এবং ৩০০ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষম পলাশ সার কারখানা ভেঙে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একীভূত ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণ করা হয়।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)-এর অধীনে প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত কারখানাটির উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। পরে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ বাণিজ্যিকভাবে ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন, যা দেশের সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বন্যপ্রাণী সেবার উদ্ধার অভিযান
চা পাতা তুলতে গিয়ে অজগর, শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে আতঙ্ক

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার একটি চা বাগানে চা পাতা সংগ্রহের সময় একটি অজগর সাপ দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শ্রমিকরা। নিরাপত্তার স্বার্থে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে সরে যান। পরে বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাপটি উদ্ধার করেন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) সংলগ্ন ভুরভুরিয়া চা বাগানের সেক্টর-৯ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রমিকরা নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে চা পাতা সংগ্রহ করছিলেন। এ সময় ঝোপের মধ্যে একটি বড় আকৃতির অজগর সাপ দেখতে পেয়ে তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা দ্রুত কাজ বন্ধ করে বাগান কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান।
খবর পেয়ে চা বাগানের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপদে অজগর সাপটি উদ্ধার করেন।
উদ্ধারকৃত অজগরটি পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জানান, বন্যপ্রাণী দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর অভিযান
দেবীদ্বারে অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে অভিযানে ২টি ড্রেজার ধ্বংস, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

কৃষিজমি, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় কুমিল্লার দেবীদ্বারে অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে দুটি অবৈধ ড্রেজার মেশিন ও প্রায় ২ হাজার ৫০০ ফুট পাইপ ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে এক ড্রেজার মালিককে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অশোক বিক্রম চাকমা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ফয়সল উদ্দিনের নেতৃত্বে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রথমে উপজেলার তুলাগাঁও গ্রামে অভিযান চালিয়ে একটি অবৈধ ড্রেজার এবং প্রায় এক হাজার ফুট পাইপ ধ্বংস করা হয়। পরে রামের দিঘিরপাড় এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে ড্রেজার পরিচালনার দায়ে মো. আব্দুস ছামাদকে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর ব্যবহৃত আরও একটি ড্রেজার এবং প্রায় এক হাজার ৫০০ ফুট পাইপ ধ্বংস করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে কৃষিজমির মাটি কাটার কারণে ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছিল। নিয়মিত এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হলে অবৈধ ড্রেজার ব্যবহার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অশোক বিক্রম চাকমা বলেন, কৃষিজমি ধ্বংস, খাল-বিল ও জলাশয়ের ক্ষতি এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এমন কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। জনস্বার্থে অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে।























