আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্তার স্বীকৃতি জরুরি

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্তার স্বীকৃতি জরুরি। ছবি : আজকের কথা
প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার নানা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশের টেকসই ব্যবস্থাপনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়াও দিবসটির গুরুত্বপূর্ণ দিক।
২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য— “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো”। এই প্রতিপাদ্যে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা
বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় জাতিগত, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত জনগোষ্ঠীর দেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যারা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি।
চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা ধরে রেখেছে।
তবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এই সমৃদ্ধির পাশাপাশি ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামনে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সংবিধানে সমঅধিকারের অঙ্গীকার
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের সমতা ও ন্যায়বিচারের মৌলিক ভিত্তি নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্র ও জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে জাতিসত্তা বা ‘Indigenous Peoples’-এর অধিকারকে আরও স্পষ্টভাবে সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোর মধ্যে আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো বেশ কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের জাতিগত বৈচিত্র্যের বিষয়টি স্বীকৃতি পেলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘Indigenous Peoples’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সাংস্কৃতিক অধিকারের কিছু বিষয় স্বীকৃত হলেও ভূমির মালিকানা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) Committee of Experts on the Application of Conventions and Recommendations (CEACR)-সহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বারবার এমন একটি পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারে।
আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা
আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনো বাংলাদেশের একটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ। Kapaeeng Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে মোট ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন ও যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অপরাধ রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত এসব ঘটনা আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার চিত্র তুলে ধরে। তবে প্রকৃত ঘটনা আরও বেশি হতে পারে।
প্রতিশোধের ভয়, সামাজিক কলঙ্ক, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার ঘাটতির কারণে অনেক ঘটনাই যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয় না।
ফলে শুধু অপরাধের বিচারই বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং সহিংসতা, বৈষম্য ও প্রান্তিকীকরণের চক্রও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারপ্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিচার বিলম্বিত হলে বাড়ে দায়মুক্তি
‘বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত’—এই বহুল প্রচলিত কথাটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেক ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রেও বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন।
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ব্যর্থতা ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে এবং অনেক ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার অভিযোগ জানাতেও নিরুৎসাহিত হন। একপর্যায়ে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অপূর্ণ বাস্তবায়ন
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে আদিবাসী প্রতিনিধিরা মনে করেন।
চুক্তিটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন জোরদার করা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা।
বিভিন্ন সরকার চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে অগ্রগতির কথা বললেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের অভিযোগ, অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণ, কার্যকর ভূমি কমিশন এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
এই বাস্তবায়ন ঘাটতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংলাপের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা
সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংরক্ষিত মহিলা আসন-১৯-এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি এ সাক্ষাতে অংশ নেয়।
বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি তুলে ধরেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি সুপারিশপত্র হস্তান্তর করেন।
আদিবাসী নেতৃবৃন্দের এই উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে তাদের অধিকার ও দাবিগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
কী করা জরুরি
একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার সমাধানে পৃথক ভূমি কমিশন গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা: আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুসহ সহিংসতার শিকার প্রত্যেক মানুষের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা, দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর বিচারপ্রক্রিয়া প্রয়োজন।
শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিকাশের জন্য টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ জোরদার: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও কার্যকর ও সক্ষম করে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ ধারাগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে নতুন করে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন।
বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের শক্তি
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের বাইরের কেউ নয়; তারা বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস ও রাষ্ট্র গঠনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও বহু আদিবাসী সদস্য বাঙালি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেছেন।
তাদের এই অবদান শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অধিকার, মর্যাদা ও সমান নাগরিক সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শক্তি সাংস্কৃতিক একরূপতায় নয়; বরং তার বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত। বিভিন্ন জাতিসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সহাবস্থানই দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষা কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সমঅধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের অংশ।
একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে পরিচয় বা জাতিসত্তার কারণে কেউ পিছিয়ে থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক সমান মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচতে পারবে।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
জামিনে মুক্তদের বরণে প্রস্তুতি
ফুলের মালা হাতে কারাফটকে ‘শোডাউন’, আ.লীগের ৪ নেতাকর্মী আটক

নোয়াখালী জেলা কারাগারের সামনে ফুলের মালা নিয়ে ‘শোডাউন’ করার অভিযোগে আওয়ামী লীগের চার নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে সদর উপজেলার জেলা কারাগারের ফটক থেকে তাদের আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে এক ব্যাগ ফুলের মালা উদ্ধার করা হয়।
আটকরা হলেন—সদর উপজেলার এওজবালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম এওজবালিয়া গ্রামের ছেরাজল হক চৌধুরী (৬৩), মেহেদী হাসান হৃদয় (২০), মো. ফারুক হোসেন (১৮) ও মো. নাজিম (১৮)। পুলিশের দাবি, আটক চারজনই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৫ জুন জুমার নামাজের পর নোয়ান্নই ইউনিয়নের বাঁধের হাট বাজারে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের উদ্যোগে প্রায় তিন হাজার নেতাকর্মী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। ওই কর্মসূচির পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে।
রোববার তাদের মধ্যে কয়েকজন জামিনে মুক্তি পেলে খবর পেয়ে একদল নেতাকর্মী ফুলের মালা নিয়ে কারাগারের সামনে জড়ো হন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক চারজন মুক্তিপ্রাপ্তদের আত্মীয় নন এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে ছবি তুলে শোডাউন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।
পুলিশের চোখে ফুলের মালা, উদ্দেশ্য ‘শোডাউন’
ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
বিশেষ বক্তব্য:
কারামুক্ত ব্যক্তিকে স্বজনদের ফুল দিয়ে বরণ করা স্বাভাবিক হলেও, দলীয় পরিচয়ে একাধিক ব্যক্তির সংগঠিতভাবে কারাফটকে অবস্থান ও শোডাউনের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে আটক ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের নয়া চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান মাহমুদ

সরকার কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে আশিকুর রহমান মাহমুদকে নিয়োগ দিয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ-২ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা: আকতারুন নেছা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগ প্রদান করা হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, “পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬”-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী তিন বছরের জন্য তাকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, জনস্বার্থে জারিকৃত এই নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
আশিকুর রহমান মাহমুদ কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার মুন্সেফ বাড়ির বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম হাজী আব্দুর রহিম মাহমুদ এবং মায়ের নাম জাহানারা মাহমুদ। নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ২১টি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে আশিকুর রহমান মাহমুদ কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত হওয়ায় তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কুমিল্লার বিশিষ্ট সমাজসেবক, ধর্ম মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের মামাতো ভাই এবং মুরাদনগর উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সৈয়দ আতিকুল্লাহ প্রিয়া।
এক অভিনন্দন বার্তায় সৈয়দ আতিকুল্লাহ প্রিয়া বলেন, “আশিকুর রহমান মাহমুদের মতো একজন দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিত্ব কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁর এই নেতৃত্বের মাধ্যমে কুমিল্লার সুপেয় পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নয়ন সাধিত হবে এবং নাগরিক সেবা পৌঁছাবে জনগণের দোড়গোড়ায়। আমি তাঁর জীবনের উত্তরোত্তর সাফল্য, দীর্ঘায়ু ও সার্বিক কল্যাণ কামনা করছি
ধর্ম, রাজনীতি ও নির্বাসনে বিস্তর ফারাক
‘শেখ হাসিনা আর আমাকে এক পাল্লায় তুলবেন না’: তসলিমা নাসরিন

শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের তুলনা টানার সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা ও তাঁর মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান, নির্বাসনের কারণ, আইনি অবস্থান এবং আদর্শের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
নিজের ফেসবুক পোস্টে তসলিমা নাসরিন বলেন, অনেকে শেখ হাসিনা ও তাঁকে একই পাল্লায় তুলছেন এবং দুজনকেই মুসলমান ও রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাঁর ভাষ্য, এই দুই দাবিই সঠিক নয়।
তসলিমা নাসরিন নিজেকে ‘হার্ডকোর নাস্তিক’ উল্লেখ করে বলেন, তিনি কোনো ঈশ্বর, ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মীয় বিধানে বিশ্বাস করেন না। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ধর্ম পালনকারী মুসলমান—এমন দাবি করেন তিনি।
নিজের ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী নন। ভারত সরকার তাঁর থাকা-খাওয়া বা জীবনযাপনের ব্যয় বহন করে না। নিজের সব খরচ নিজেই বহন করেন এবং ভারত সরকার শুধু তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সুইডেনের নাগরিক এবং সেই পরিচয়েই ভারতে বসবাস করছেন।
তসলিমা নাসরিন আরও বলেন, ভারত কোনো বিদেশি শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী বা গবেষকের কাজ ও অবদান বিবেচনা করে তাঁকে বৈধভাবে দেশটিতে বসবাসের অনুমতি দিতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের অনুমতি রাজনৈতিক আশ্রয়ের সমতুল্য নয়।
আদর্শগত পার্থক্যের কথাও তুলে ধরেন তসলিমা
শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের সবচেয়ে বড় পার্থক্যগুলোর একটি হিসেবে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন তসলিমা নাসরিন।
তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। বিপরীতে তিনি সব শিশুর জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে। তাঁর মতে, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থেকে ধর্মকে দূরে রাখা উচিত।
তসলিমা নাসরিন শেখ হাসিনা সরকারের ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পেরও সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, এসব মসজিদ একসময় শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা তিনি প্রকল্পের শুরুতেই প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতাশালী রাজনীতিক, আর তিনি ক্ষমতাহীন একজন লেখিকা। শেখ হাসিনার নির্বাসন দুই বছরের হলেও তাঁর নিজের নির্বাসন ৩২ বছরের বলে উল্লেখ করেন তসলিমা।
‘ফেরার দরজা বহুদিন ধরেই বন্ধ’
বাংলাদেশে নিজের ফেরার প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেন, বাংলাদেশের কোনো সরকারই তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করেনি এবং তাঁর বিদেশি পাসপোর্টেও ভিসা দেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে ফেরার পথ তাঁর জন্য বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশে ফেরার পথ বন্ধ রাখার দায় শেখ হাসিনা সরকারেরও রয়েছে।
তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরে তসলিমা বলেন, তিনি চান শেখ হাসিনা নিজ দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করুন এবং রাজনীতি করুন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন বলে উল্লেখ করেন।
‘আমি শেখ হাসিনার দেশে ফেরা চাই’
তসলিমা নাসরিনের ভাষ্য, তিনি নিজের দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করতে চান এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই প্রত্যাশা রাখেন। তাঁর মতে, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও তাঁর মতো একজন ধর্ম ও জিহাদবিরোধী লেখিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফিরতে পারলেও তাঁকে জিহাদিদের হামলার ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে। এ কারণে দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন কি না, সেটি নিয়েও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বাক্স্বাধীনতা নিয়েও শেখ হাসিনার সমালোচনা
তসলিমা নাসরিন নিজেকে বাক্স্বাধীনতার প্রবল সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনার সঙ্গে এ ক্ষেত্রেও তাঁর পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত আত্মজীবনী ‘আমার মেয়েবেলা’ নিষিদ্ধ করেছিল এবং সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।
সবশেষে তসলিমা নাসরিন বলেন, নিজের দেশ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হওয়া ছাড়া তাঁর সঙ্গে শেখ হাসিনার বড় কোনো মিল নেই। শুধু এই একটি মিলের ভিত্তিতে দুজনের পরিচয়, অবস্থান, আদর্শ ও জীবনসংগ্রামকে একইভাবে দেখাকে তিনি ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানো হিসেবে উল্লেখ করেন।
























