উপমহাদেশের গর্ব কানাই লাল শীল, অথচ জন্মভিটা আজও অবহেলায় ধুঁকছে

উপমহাদেশের গর্ব কানাই লাল শীল, অথচ জন্মভিটা আজও অবহেলায় ধুঁকছে। ছবি : আজকের কথা
বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে দোতারার সুরের কথা উঠলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি দোতারা বাদক, লোকশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার কানাই লাল শীলের নাম। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের মতো গুণীজনদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি বাংলা লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন অনন্য অবদানে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পীর জন্মভিটা আজও অবহেলা আর অযত্নে পড়ে আছে। নেই কোনো স্মৃতি জাদুঘর, সংগীতচর্চা কেন্দ্র কিংবা স্থায়ী সংরক্ষণ উদ্যোগ। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত অমূল্য নিদর্শন।
জন্মভিটায় নীরবতা, হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কানাই লাল শীলের বাড়ির পরিবেশে নেমে এসেছে নীরবতা। বাড়ির পাশে একটি জরাজীর্ণ সিমেন্টের স্মৃতিফলক ছাড়া তাঁর স্মৃতির তেমন কোনো চিহ্ন নেই। ধুলা-ময়লায় ঢাকা ফলকটি সংস্কারের অভাবে নষ্ট হওয়ার পথে।
যে তমাল গাছের নিচে বসে তিনি দোতারার সুরে মানুষকে মুগ্ধ করতেন, সেই গাছও আর নেই। ঘরের ভেতরে তাঁর একটি ছবি ও কয়েকটি বই থাকলেও সেগুলোও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি ঝোঁক
১৮৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর ফরিদপুরের লস্করপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কানাই লাল শীল। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতাকে হারালেও ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। আট বছর বয়সে বেহালার হাতেখড়ি, পরে দোতারার প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে লোকসংগীতের কিংবদন্তিতে পরিণত করে।
দোতারার সুরে ছড়িয়ে পড়ে খ্যাতি
দরবেশ দাণ্ড শাহের মাজারে কিংবদন্তি দোতারা বাদক তরবন সরকারের পরিবেশনা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন কানাই লাল শীল। এরপর কবিগান, যাত্রাপালা, গাজীর গান, কীর্তনসহ বিভিন্ন ধারার লোকসংগীতে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন।
জসীমউদ্দীন, নজরুল ও আব্বাসউদ্দীনের ঘনিষ্ঠ সহচর
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের হাত ধরেই কলকাতায় লোকসংগীতের বড় পরিসরে প্রবেশ করেন কানাই লাল শীল। সেখানে আব্বাসউদ্দীন আহমদের সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি গান লেখা ও সুর করা শুরু করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানেও নিয়মিত দোতারা বাজিয়েছেন তিনি।
পরে অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা এবং দেশভাগের পর ঢাকা বেতারে দীর্ঘদিন নিয়মিত শিল্পী হিসেবে কাজ করেন।
কালজয়ী গানের স্রষ্টা
দোতারা বাদক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন দক্ষ গীতিকার ও সুরকার। তাঁর লেখা ও সুর করা গান পরিবেশন করেছেন শচীন দেব বর্মন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আব্দুল আলীম, ফেরদৌসী রহমানসহ বাংলা সংগীতের বহু কিংবদন্তি শিল্পী।
একুশে পদকে সম্মানিত
১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন কানাই লাল শীল। বাংলা লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে (মরণোত্তর) তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
নাতির ঘরে টিকে আছে স্মৃতির শেষ আশ্রয়
বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে কুমোত কান্ত শীলের ছেলে বাদল চন্দ্র শীল পৈতৃক বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
তিনি বলেন, “বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস পেয়েছি। প্রশাসনের অনেকেই আসার কথা বলেছিলেন, কিন্তু কেউ আসেননি। এখানে একটি সংগীতচর্চা কেন্দ্র, লাইব্রেরি ও স্মৃতি সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হলে নতুন প্রজন্ম উপকৃত হবে।”
তিনি আরও জানান, আর্থিক সংকটের কারণে গত দুই বছর ধরে কানাই লাল শীলের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
পরিবারের আক্ষেপ
বাদল চন্দ্র শীলের স্ত্রী মাধুরী শীল বলেন, “কেউ কখনো আমাদের খোঁজ নেয়নি। সরকারি কোনো উদ্যোগও নেই। শুধু আশ্বাসই শুনে যাচ্ছি।”
১৯৯৪ সালে নিজ গ্রামে পুনঃসমাধি
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর পর ঢাকার পোস্তখোলায় দাফন করা হলেও ১৯৯৪ সালে তাঁর দেহাবশেষ নিজ গ্রাম লস্করপুরে এনে পুনঃসমাধিস্থ করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি স্মৃতিফলক থাকলেও সেটিরও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নেই।
গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি
গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও স্থানীয় বিশিষ্টজনদের মতে, কানাই লাল শীল শুধু ফরিদপুরের নন, পুরো উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাঁর জন্মভিটাকে সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর, সংগীতচর্চা কেন্দ্র ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু মূল্যবান স্মৃতি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
প্রশাসনের আশ্বাস
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানিয়েছেন, কানাই লাল শীলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি পরিদর্শন করে সংরক্ষণের সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “কানাই লাল শীল শুধু বাংলাদেশের নয়, উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান শিল্পী। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
লোকসংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। তবে তাঁর জন্মভিটা যদি অবহেলায় হারিয়ে যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসেরও এক অমূল্য অধ্যায়। তাই সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা—সরকার, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে কানাই লাল শীলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত করা হোক।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী, দেখতে ছুটে গেলেন বাণিজ্যমন্ত্রী

সিলেটে চিকিৎসাধীন আরিফুল হক চৌধুরী, চলছে হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা
সিলেটে সরকারি সফরে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে হাসপাতালে ছুটে যান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ সময় তিনি মন্ত্রীর সহধর্মিণী শামা হক চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকার মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ মন্ত্রীকে দেখতে যান বাণিজ্যমন্ত্রী।
জানা গেছে, শুক্রবার সকালে সরকারি কাজে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় যাওয়ার পথে হঠাৎ বুকে ব্যথা, শরীর ঝিমঝিম করা ও অস্বস্তি অনুভব করেন আরিফুল হক চৌধুরী। একপর্যায়ে তাঁর শরীরের ডান পাশ দুর্বল হয়ে আসে। পাশাপাশি কাঁপুনি ও অতিরিক্ত ঘাম দেখা দেয়।
এ অবস্থায় পূর্বনির্ধারিত সফরসূচি বাতিল করে দ্রুত তাঁকে সিলেট নগরীর মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বর্তমানে হাসপাতালের কার্ডিওলজিস্ট ডা. শিশির বসাক ও নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. নজরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। তাঁর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কয়েকটি পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও বাকি প্রতিবেদন হাতে আসার পর পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অসুস্থতার কারণে কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত সরকারি সফর বাতিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, কোম্পানীগঞ্জে সরকারি কাজ শেষে মন্ত্রী হঠাৎ শরীরের ডান পাশ দুর্বল হয়ে আসা ও কাঁপুনি অনুভব করেন। একই সঙ্গে তিনি অস্বস্তিবোধ করছিলেন এবং অতিরিক্ত ঘামছিলেন। পরে তাঁকে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, মন্ত্রীর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কয়েকটি পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। বাকি প্রতিবেদন পাওয়ার পর চিকিৎসার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বর্তমানে তিনি আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ রয়েছেন।
বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন এবং সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী।
ব্রাহ্মণপাড়ায় রাষ্ট্রীয় সম্মান ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধার দাফন, দায় এড়াতে ইউএনও-পুলিশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারকে। একাত্তরের রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করা এই বীরের শেষ বিদায়ে গার্ড অব অনার না পাওয়ার ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ঘটনার দায় নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে দেখা দিয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। এক পক্ষের দাবি, প্রশাসনের কেউ উপস্থিত না থাকায় পুলিশ গার্ড অব অনার দিতে পারেনি; অন্য পক্ষের বক্তব্য, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না।
৭৮ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার দীর্ঘ কর্মজীবনে যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সেখানে প্রথম জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া সদর ইউনিয়নের মহালক্ষীপাড়া গ্রামে নেওয়া হয়।
মরদেহ গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল সাড়ে ৫টা পেরিয়ে যায়। পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী আশা করেছিলেন, দেশের জন্য জীবন বাজি রাখা এই বীরকে শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সালাম ও গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান ছাড়াই তাঁকে দাফন করা হয়।
মরহুমের ভাই শাহজাহান আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম আমার ভাইকে শেষ সম্মানটুকু জানিয়ে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। আমরা আজ লজ্জিত। যে মানুষটি ৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন করল, সে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না।’
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া সম্ভব না হলেও প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি এসে অন্তত শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারতেন। কিন্তু সেটিও করা হয়নি।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া মাস্টার জানান, গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালামের জন্য তাঁরা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলাম তাঁদের জানিয়েছিলেন, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না।
সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তিনি মরহুমের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার না দেওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র সমালোচনা চলছে।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, গার্ড অব অনারের জন্য পুলিশ সদস্যদের একটি দল পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ লাইন থেকে বিউগল বাজানোর দলও এসেছিল। কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় পুলিশ একা গার্ড অব অনার দিতে পারেনি। তবে তাঁরা জানাজায় অংশ নিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও মুন্নী ইসলাম বলেন, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া হয় না। তারপরও তাঁরা প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকা থেকে মরদেহ আনা নিয়ে দ্বিধা ছিল। মাগরিবের পর কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এ কারণে গার্ড অব অনার দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ সময় তিনি বিষয়টি সংবাদে প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ঘটনাটি যেন ব্রাহ্মণপাড়া তথা কুমিল্লার ‘মান-সম্মানের প্রশ্ন’ হিসেবে সংবাদে তুলে ধরা না হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাঁদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কেন দেখা দিল? পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই চিরবিদায় নিতে হলো মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সন্তানকে।
দারোরায় বাজিমাত করালেন সৈয়দ কায়েস মীর, ২১ কিমি সড়ক পুনর্নির্মাণে অনুমোদন

বি-স্ট্রং প্রকল্পে মুরাদনগরের ১০ সড়ক ও একাধিক কালভার্ট-ড্রেনের উন্নয়ন, দারোরা ইউনিয়নেই প্রায় ২০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের প্রত্যাশা
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দারোরা ইউনিয়নে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণে প্রায় ২১ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল রিকভারি, ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স (বি-স্ট্রং) প্রকল্পের আওতায় এসব কাজ বাস্তবায়িত হবে।
স্থানীয়ভাবে এ উন্নয়ন উদ্যোগের পেছনে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের আপন মামা, জননেতা সৈয়দ কায়েস আহমেদ মীরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁর প্রচেষ্টায় দারোরা ইউনিয়নের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন ও পুনর্নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
এলজিইডি হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা থেকে জারি করা দাপ্তরিক স্মারক অনুযায়ী, মুরাদনগর উপজেলার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসনে পৃথক দুটি প্যাকেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দুই প্যাকেজে মোট ২০ দশমিক ৮২৯ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসনের পাশাপাশি বক্স কালভার্ট ও ইউ-ড্রেন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম প্যাকেজের আওতায় ১১ দশমিক ৪০১ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন এবং ৫ দশমিক ৪০ মিটার বক্স কালভার্ট/ইউ-ড্রেন নির্মাণ করা হবে। এ প্যাকেজে রয়েছে খুরুইল বাজার-শিদ্বেশ্বরী বাজার-দারোরা ইউপি-দারোরা বাজার-রায়তলা সড়ক, চন্দানাইল-সালপা-পান্নাই সড়ক (পিপুরিয়াকান্দা সড়ক হয়ে), পুষ্করুনিপার সড়ক (শহীদ রামিউদ্দিন সড়ক), দৌলতপুর-ধনপতিখোলা সড়ক এবং নাঈরপাড়-আলখাল সড়ক।
দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতায় ৯ দশমিক ৪২৮ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন এবং ১ দশমিক ৮০ মিটার ইউ-ড্রেন নির্মাণ করা হবে। এ তালিকায় রয়েছে পালাসুতা (দারোরা ইউপি)-সুবিলাড়চর (বুরারচর বাজার) সড়ক, শুশুন্ডা বাজার-দারোরা বাজার সড়ক (পায়ব রোড হয়ে), সুরানন্দি-নিয়ামতকান্দি আরএইচডি সড়ক, চাপিতলা-বাইড়া সড়ক এবং পিপুরিয়া-রোয়াচলা-দানাপাতিখোলা সড়ক।
বিশেষ করে দারোরা ইউনিয়নের খুরুইল বাজার-শিদ্বেশ্বরী বাজার-দারোরা ইউপি-দারোরা বাজার-রায়তলা সড়ক, পালাসুতা-সুবিলাড়চর সড়ক, শুশুন্ডা বাজার-দারোরা বাজার সড়ক এবং সুরানন্দি-নিয়ামতকান্দি সড়কের উন্নয়ন স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দারোরা বাজারের উন্নয়নেও প্রায় কোটি টাকার বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, উভয় প্যাকেজের কাজ শেষ করতে ৫৪০ দিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে ই-জিপি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের জন্য কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে অনুমোদিত দাপ্তরিক স্মারকে প্রকল্পগুলোর নির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ উল্লেখ করা হয়নি। প্রাক্কলন যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হবে।
এদিকে সৈয়দ কায়েস আহমেদ মীরের প্রচেষ্টায় দারোরা ইউনিয়নে সড়ক, কালভার্ট ও বাজার উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ২০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইউনিয়নের গ্রামীণ যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনসাধারণের দৈনন্দিন চলাচলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






























