মানবিকতার প্রতীক প্রবীর কান্তি বালা
ফরিদপুর সাংবাদিকতার জীবন্ত কিংবদন্তি পান্না বালা
চার দশকের সাংবাদিকতা যাত্রায় পান্না বালা, সততা ও সাহসের এক অনন্য নাম
পান্না বালা নামটি ফরিদপুরের সাংবাদিকতা অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই সততা, সাহস ও পেশাদারিত্বের প্রতীক হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে। প্রবীর কান্তি বালা নামে জন্ম হলেও সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের কাছে তিনি বেশি পরিচিত পান্না বালা নামেই। টানা চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি শুধু সংবাদ পরিবেশন করেননি, গড়ে তুলেছেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৬৪ সালের ৮ জানুয়ারি ফরিদপুরের একটি বনেদি ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পান্না বালা। তাঁর বাবা গৌর চন্দ্র বালা ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক যুক্তফ্রন্ট সরকারের বন ও খাদ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা ছিলেন। অন্যদিকে মা অঞ্জলী বালা দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবা ও শিশু সংগঠন নিয়ে কাজ করে আসছেন।
পান্না বালা ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছেন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ পরিবেশে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সফল। বড় ভাই বিপ্লব বালা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। অন্য ভাই-বোনদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও মনোযোগী। ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনেই সংবাদপত্রের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্ম নেয় তাঁর। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের পেশা নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম।
পান্না বালা ১৯৮২ সালে ফরিদপুর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘আল মুয়াজ্জিন’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর স্থানীয় দৈনিক গণসংহতি, সাপ্তাহিক প্রগতির দিন, দৈনিক ভোরের রানারসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতায় নিজেকে দক্ষ করে তোলেন।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ফরিদপুর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন তিনি। মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে অল্প সময়েই পাঠক ও সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন। পরে ২০২২ সালে তাঁকে ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
পান্না বালা সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে মনে করেন সততা ও নিরপেক্ষতাকে। তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পক্ষ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেননি। সত্য প্রকাশে আপস না করার মানসিকতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
ফরিদপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি অত্যন্ত সম্মানিত। কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সবসময় সংবাদ ও সত্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
পান্না বালা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছেও একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তরুণদের সংবাদ লেখার কৌশল, তথ্য যাচাই এবং পেশাগত নৈতিকতা সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকেন তিনি। অনেক নবীন সাংবাদিক তাঁর কাছ থেকেই সাংবাদিকতার হাতে-খড়ি নিয়েছেন।
সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে জীবনে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাঁকে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে হামলা, হুমকি ও চাপের শিকার হয়েছেন একাধিকবার। কিন্তু কখনো কলম থামাননি। বরং আরও দৃঢ়ভাবে সত্য প্রকাশের কাজ চালিয়ে গেছেন।
পান্না বালা ব্যক্তিজীবনেও অত্যন্ত সাদামাটা ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে পরিচিত। বনেদি পরিবারের সন্তান হয়েও অহংকার তাঁকে স্পর্শ করেনি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার বিরল গুণ রয়েছে তাঁর। তবে মিথ্যা, অন্যায় কিংবা অপপ্রচার দেখলে তিনি সবসময় সরব হয়েছেন।
তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো জনগণের পক্ষে কথা বলা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। তাঁর ভাষায়, “সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস থাকতে হবে। জনগণের অধিকার ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরাই সাংবাদিকতার আসল দায়িত্ব।”
পান্না বালা আরও বিশ্বাস করেন, গণমাধ্যম সমাজের আয়না। সেই আয়নায় বিকৃতি দেখা দিলে পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বর্তমান সময়ে গুজব ও অপতথ্যের ভিড়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি মানুষের কান্না, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার গল্প তুলে ধরেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তাঁর সংবাদে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল, তেমনি ছিল মানবিকতার স্পর্শ। এ কারণেই পাঠকের কাছে তিনি বিশ্বাসযোগ্য এবং সহকর্মীদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম।
পান্না বালা আজ শুধু একজন সাংবাদিক নন, ফরিদপুরের সাংবাদিকতা অঙ্গনের এক জীবন্ত ইতিহাস। সততা, সাহস ও পেশাদারিত্ব দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—আদর্শ ধরে রেখেও দীর্ঘদিন সম্মানের সঙ্গে সাংবাদিকতা করা সম্ভব।

























