চিকিৎসা নিতে গিয়ে দখল ৬০০ কোটি টাকার হাসপাতাল

চান্দিনায় চাঁদাবাজি না পেয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে আটক করে পুলিশের হাতে দিতে চেয়েছিল বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়করা, তেমনি আরেক ঘটনায় ৬০০ কোটি টাকার হাসপাতালও দখল করে নিয়েছে এ সমন্বয়করা---- ছবি। দৈনিক আজকের কথা।
দেশের একমাত্র আধুনিক সরকারি চক্ষু হাসপাতাল জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট বর্তমানে কার্যত চিকিৎসা সেবা বন্ধ রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের আহতরা দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটি দখল করে রাখায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জামসহ হাসপাতালটি এখন একপ্রকার আবাসিক হোটেলে রূপ নিয়েছে।
গত ২৮ মে নিছক ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থেকে হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দেন জুলাই আন্দোলনের আহতরা। এরপর থেকে নিরাপত্তা শঙ্কায় কেউ হাসপাতালে আসছেন না। হাসপাতালের সব সেবা বন্ধ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, শহীদ জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ অনেকে চেষ্টা করেও বিষয়টির সমাধানে নিয়ে আসতে পারেননি।
এরই মধ্যে গত কয়েকদিন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, সহকারী উপদেষ্টাসহ নানান পক্ষের তৎপরতায় দফায় দফায় বৈঠক হয়, তদন্ত কমিটি কাজ করে। অবশেষে গত ৩ জুন হাসপাতালের জরুরি বিভাগটি চালুর সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি দেশসেরা চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বলা হয়, মেডিকেল বোর্ড ৪ জুন হাসপাতাল পরিদর্শন করবে। একই সঙ্গে বোর্ড জুলাই আহতদের চিকিৎসা সমন্বয় এবং সামগ্রিক কার্যক্রম নির্ণয় করবে।
সরকারের ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জামসমৃদ্ধ অত্যাধুনিক
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এ হাসপাতালটি এত দিন বন্ধ। প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের (জুলাই আহতদের) কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের কথা হলো, ‘আমরা ঢাকায় এসে কোথায় থাকবো? বলছেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা
যেমন সিদ্ধান্ত তেমন কাজ। বন্ধের এক সপ্তাহ পর ৪ জুন পুলিশি পাহারায় যথারীতি জরুরি বিভাগ চালু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরাও পরিদর্শনে আসেন। তারা হাসপাতালে এসে ২০৭ নম্বর রুমে ভর্তি থাকা ৫৪ জন জুলাই আহতের সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত বৈঠকে বসতে চান। আহতদের মধ্যে ৩০ জন তাদের ডাকে সাড়া দেন। তাদের সবার চোখ পরীক্ষা করেন বোর্ডের সদস্যরা। তাদের সবাইকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দেওয়া এবং পুনর্বাসন করার সুপারিশ করে মেডিকেল বোর্ড। বাকি ২৪ জন হাজির না হওয়ায় তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করতে পারেননি।
মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা চলে যাওয়ার পর জরুরি বিভাগের সামনে আবাসিক চিকিৎসকের (আরএস) রুম থেকে হইহুল্লোড় শোনা যায়। এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, জুলাই আহতরা চিকিৎসকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত।
এর মধ্যেই নিরাপত্তাজনিত কারণে আবাসিক চিকিৎসকসহ উপস্থিত কয়েকজন চিকিৎসক হাসপাতাল ত্যাগ করেন। ভারপ্রাপ্ত পরিচালককে তাদের দাবির প্রতি সম্মতি দিয়েই পুলিশ প্রটোকলে বের হতে হয়। জুলাই আহতরা সাফ জানিয়ে দেন, ‘নানান কারণে আমাদের ঢাকায় আসতে হয়। ঢাকায় এসে থাকবো কোথায়? এজন্য আমাদের পক্ষে হাসপাতাল ছাড়া সম্ভব নয়।’ এসময় জুলাই আহতরা তাদের রিলিজের যাবতীয় কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন।
এ নিয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালটির একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, সরকারের ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম সমৃদ্ধ অত্যাধুনিক এ হাসপাতালটি এত দিন বন্ধ। প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের (জুলাই আহতদের) কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের কথা হলো, ‘আমরা ঢাকায় এসে কোথায় থাকবো?’ তাদের থাকার জায়গা সরকার ভিন্ন কোথাও দিতে পারে। কিন্তু হাসপাতাল তো আবাসিক হোটেল বা লিল্লাহ বোর্ডিং হতে পারে না। এখানে জরুরি প্রয়োজনে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, ‘জুলাই আহতদের কেউ কেউ এত দিন বলেছে, আমাদের চিকিৎসা ভালো নয়। সরকার এখন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের চেয়ারম্যান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগের প্রধান, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) চক্ষু বিভাগের প্রধান এবং ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ঢাকার বিভাগীয় প্রধানের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে দিলো। দেশসেরা এই চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসার বিষয়ে মতামত দিলেন। কিন্তু তারা এটাও মানে না।’
“অবশ্য, সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে এসেও একজন জুলাই আহত হাসপাতালের পরিচালকের সামনে বলেন, ‘ওটা (মাউন্ট এলিজাবেথ) ভুয়া হাসপাতাল। আমাদের আমেরিকা বা ইউরোপ পাঠান’।” বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক।
কী বলছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট মেডিকেল বোর্ড
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাক আহমেদ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল ওয়াদুদ, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) চক্ষু বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাঈল হোসেন এবং ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোমিনুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের যৌথ স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন গত ৪ জুন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর জমা দেওয়া হয়।
তারা কিন্তু এরই মধ্যে বেশিরভাগ বাড়ি চলে গেছে। এখন মাত্র ৭-৮ জন আছে। তাদের কেউ রিলিজ নেয়নি। যে যার মতো আবার এসে থাকবে, এমনটাই তাদের চাওয়া। তাই হাসপাতাল থেকে তারা রিলিজ নিতে চায় না।- ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম
প্রতিবেদনে চারটি মতামত তুলে ধরা হয়
১. রোগীদের প্রদত্ত চিকিৎসা এবং চলমান চিকিৎসা সন্তোষজনক; ২. আপাতত রোগীদের ছাড়পত্র দিয়ে প্রয়োজনে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের জন্য উপদেশ দেওয়া হলো; ৩. বিশেষ ক্ষেত্রে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), ইস্পাহানি ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করার জন্য উপদেশ দেওয়া হলো এবং ৪. তাদের অতিসত্বর যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য জোর সুপারিশ করা হলো।
‘সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ ভারপ্রাপ্ত পরিচালক’
প্রতিবেদন মোতাবেক মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত প্রতিপালনে কাজ করতে গিয়ে সেদিন (৪ জুন) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ ছিলেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম।
জানতে চাইলে ডা. জানে আলম বলেন, ‘গত বুধবার (৪ জুন) মেডিকেল বোর্ড এসেছিল। তখন হাসপাতালে ভর্তি ৫৪ জন জুলাই আহতের মধ্যে ৩০ জন বোর্ডের ডাকে সাড়া দেয়। চিকিৎসাপত্র ও নানাবিধ রিপোর্ট দেখে বোর্ড সিদ্ধান্ত দেয়, তাদের হাসপাতালে থাকার দরকার নেই। তারা বাড়ি চলে যাবে। সমস্যা হলে ফলোআপ করবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা সব কাগজপত্র রেডি করেছিলাম। কিন্তু তারা মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত মানেনি। তারা তাদের মতো থাকবে। কোনো অর্ডার মানবে না। তাদের কথা হচ্ছে, এখানে বসে ওরা ওদের বার্গেনিং করবে। সরকার থেকে নানান দাবি আদায় করে নেবে।’
ডা. জানে আলম বলেন, ‘ওইদিন তো তারা (জুলাই আহতরা) আমাকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রেখেছে। পরে আমি তাদের দাবির প্রতি সহমত প্রকাশ করে পুলিশের সহায়তায় বেরিয়ে এসেছি।’
বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। এ ঘটনায় সারাদেশে মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। মাত্র কয়েকজন আহতের বিশৃঙ্খল আচরণের কারণে সারাদেশে জুলাই আহত ও পঙ্গুদের ত্যাগ বিতর্কিত হচ্ছে।- সমন্বয়ক
‘তারা কিন্তু এরই মধ্যে বেশিরভাগ বাড়ি চলে গেছে। এখন (৬ জুন রাত পর্যন্ত) মাত্র সাত-আটজন আছে। তাদের কেউ রিলিজ নেয়নি। যে যার মতো আবার এসে থাকবে, এমনটাই তাদের চাওয়া। তাই হাসপাতাল থেকে তারা রিলিজ নিতে চায় না’- যোগ করেন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।
মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দিলো, জুলাই আহতদের হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই। আবার হাসপাতালে থেকেও তাদের চিকিৎসা হচ্ছে না, যেহেতু হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম বন্ধ। তাহলে তারা এখন কী হিসেবে সেখানে থাকছে? আবাসিক হোটেল বা লিল্লাহ বোর্ডিং হিসেবে কি না—জানতে চাইলে ডা. জানে আলম বলেন, ‘ওই রকমই। তাদের ঢাকায় থাকা দরকার। এখন হাসপাতালকে বেছে নিয়েছে থাকার জন্য।’
চক্ষু হাসপাতালে থাকা জুলাই আহতদের মধ্যে একজন হলেন কুষ্টিয়ার মো. কোরবান শেখ হিল্লোল। তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই, এই গ্যাঞ্জামটা আমাদের ছিল না। আমাদের দাবি-দাওয়া অনেকবার দিয়েছি। আমার মনে হয়, আহতরা আর দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলবে না। সারা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষের খালি দাবি দাবি দাবি। দেশটা আমার আপনার সবার ভাই। মানবতার দিক দিয়ে কেউ না কেউ ছাড় না দিলে দেশটা আগাবে কী করে ভাই? আর কত দাবি দেব ভাই? চিকিৎসা, পুনর্বাসন, এ ও বলে বলে, আপনারা নিজেরাও তো জানেন। প্রত্যেকটা জায়গায় তো একই কথা। আমরা এ ব্যাপারে আর কথা বলব না এ রকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার, দেশ যেটা ভালো মনে করে করুক।’
হাসপাতাল আবার চালু হোক, এ বিষয়টি মেডিকেল বোর্ডকে বলেছেন কিনা? জবাবে হিল্লোল বলেন, ‘গত কয়েকদিন যাবৎ আমরা বলেছি, যারা আসছিলেন তাদের কাছে আমরা রিকোয়েস্ট করেছি। আমাদের ট্রিটমেন্ট রিলেটেড ব্যাপারগুলো নিয়ে আপনারা কী করবেন, এটা আপনাদের ব্যাপার। বাট পাবলিক যারা আই হসপিটাল হিসেবে এখানে আসেন, তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সবার। তারা সহমত হয়েছেন যে না এটা দরকার।’
নেপথ্যে পাঁচ কারণ
জুলাই আহতরা কেন চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও হাসপাতাল ছাড়ছেন না—এ নিয়ে অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি কারণ উঠে এসেছে। হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক, কর্মচারী, রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এবং একাধিক দিন সরেজমিনে পরিদর্শন করে এই কারণগুলো জানা গেছে।
১. সেটেল হওয়ার জন্য ইউরোপ-আমেরিকা যাওয়া অথবা যথাযথ পুনর্বাসনের আশায় তারা হাসপাতালে থাকছেন। তাদের ধারণা, হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেলে সরকার বা কর্তৃপক্ষের নজর তাদের দিকে থাকবে না।
২. জুলাই আহতদের মধ্যে দু-একজন অর্থের বিনিময়ে অন্য রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি, অপারেশনের সিরিয়াল এগিয়ে দেওয়াসহ নানান তদবিরে জড়িয়ে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ সেখানে বসে ওই হাসপাতালসহ ঢাকার অন্য হাসপাতালগুলোর নিয়োগ ও টেন্ডারে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন। জোটবদ্ধ হয়ে হাসপাতাল ও বিভিন্ন দপ্তরে যাচ্ছেন।
৩. হাসপাতালে অবস্থান করা দু-একজনের যাওয়ার মতো জায়গাও নেই। তারা বউ-বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে থাকেন। একজনের নামে দুই থানায় মাদক মামলা আছে, অভিযোগপত্র দাখিলও হয়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে চলে গেলে গ্রেফতারের ভয় আছে তার।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের আহ্বানে তাৎক্ষণিক যে কোনো কর্মসূচিতে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে যোগ দেন এই হাসপাতালে অবস্থান করা আহতরা। যে কারণে তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন না ছাত্র সমন্বয়করাও।
৪. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের আহ্বানে তাৎক্ষণিক যে কোনো কর্মসূচিতে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে যোগ দেন এই হাসপাতালে অবস্থান করা আহতরা। যে কারণে তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন না ছাত্র সমন্বয়ক ও এনসিপি নেতারাও।
৫. জুলাই আন্দোলনে এই আহতদের অনেকের বাড়ি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায়। তাদের জুলাই ফাউন্ডেশনসহ নানান জায়গার কাজে ঢাকায় আসতে হয়। ঢাকায় তাদের থাকার জায়গা নেই। তাই হাসপাতালটিতে দখলে রাখা সিট তারা ছাড়তে চায় না। এখানে যখন-তখন যেন এসে থাকা যায়, খাওয়াও পাওয়া যায়—এটিই তারা চান।
এরকম অন্তত পাঁচটি কারণে হাতেগোনা কয়েকজন অন্য জুলাই আহতদের নানাভাবে বুঝিয়ে হাসপাতাল দখলে রাখতে উদ্বুদ্ধ করছেন। আহতদের মধ্যে যারা বাড়িতে আছেন তাদেরও এই হাসপাতালে এসে সিট দখল নেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তারা অন্যদের বলছেন, সরকার জুলাই আহতদের দুই হাজার ৬০০ ফ্ল্যাট দেবে। ঢাকায় থাকলে ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে। চলে গেলে দেবে না।
এই জুলাই আহতরা অন্য সুযোগ-সুবিধাও একে অন্যের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছেন। বিভিন্ন সহযোগিতার অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে গ্রুপ, সাব-গ্রুপও হয়েছে। মাঝেমধ্যে হাসপাতালের ভেতরে নিজেরাই মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছেন।
একজনেরও হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই: পরিচালক
ছুটিতে থাকা হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা স্বীকার করি যে, তারা (জুলাই আহত) অনেক বড় স্যাক্রিফাইস করেছে। তাদের অনেকের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত, অনেকের এক চোখ ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা সাধ্যের পুরোটা দিয়েই চিকিৎসা দিয়েছি। এমনকি যাদের প্রয়োজন তাদের বিদেশে পাঠিয়েছি। বিদেশ থেকে বিখ্যাত ডাক্তারদের এনেও চিকিৎসা করিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘তাদের এখন প্রয়োজন পুনর্বাসন। সেটিও মন্ত্রণালয়সহ সব জায়গায় বলেছি। সমন্বিত প্রচেষ্টা চলমান। এরই মধ্যে পরপর কয়েকটি ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। যেসব ঘটনায় আমরা বিব্রত। তারপরও তাদের মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছিলাম। সর্বশেষ গত ২৮ মে তারা যেভাবে চিকিৎসক ও স্টাফদের গায়ে হাত তুলেছে, এতে তারা (ডাক্তার-স্টাফ) অনিরাপদ বোধ করছেন। হাসপাতালে আসতে চাইছেন না।’
‘জুলাই আহতদের চিকিৎসাটা এখন মূলত ফলোআপ বা চলমান চিকিৎসা। এজন্য তাদের এনআইওর (জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল) মতো বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। যার যার এলাকায় ফেরত যেতে পারে। তাদের অসুস্থতার সিমটম দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মেডিকেল কলেজগুলোর চক্ষু বিভাগে যাবে, সেখানে তাদের সেবা দিতে পারবে।’
অধ্যাপক ডা. খায়ের আরও বলেন, ‘যদি ওই হাসপাতাল মনে করে অস্ত্রোপচার লাগবে বা বিশেষায়িত কোনো সেবা লাগবে, তারা এনআইওতে রেফার করবে। আমরা সেটা করে দেবো। অথবা সরকার যদি মনে করে তাদের ঢাকার হাসপাতালে রেখেই সেবা দেবে, তাহলে অন্য হাসপাতালে শিফট করতে হবে।’
কাজটা সহজ নয়, আমরা চেষ্টা করছি: স্বাস্থ্য সচিব
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাসপাতালে যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটা স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা কীভাবে চালু করা যায়, চেষ্টা হচ্ছে। আহতদের বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া এবং পুনর্বাসনের দাবির বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট। আমরা চেষ্টা করছি, যাদের বিদেশ যাওয়া প্রয়োজন, যাবে। পুনর্বাসন কমন দাবি, কিন্তু একেকজনের একেকভাবে পুনর্বাসন করতে হবে, কাজটা সহজ নয়। আমরা চেষ্টা করছি।’
মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তও তো জুলাই আহতরা মানে না, এখন কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি সময় নিয়ে ভাবছি। যেহেতু ঈদের ছুটিতে তারা বেশিরভাগ চলে গেছে। এ মুহূর্তে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছি। এটা খুবই সংবেদনশীল ব্যাপার। গত ৪ জুনের ঘটনা আপনারা জানেন, আমরাও জানি। আমরা চেষ্টা করছি, ঈদের পর পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক করা যায়।’
প্রয়োজন সম্মিলিতভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। এ ঘটনায় সারাদেশে মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। মাত্র কয়েকজন আহতের বিশৃঙ্খল আচরণের কারণে সারাদেশে জুলাই আহত ও পঙ্গুদের ত্যাগ বিতর্কিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ছাত্র সমন্বয়কদের সমন্বয়ে সম্মিলিতভাবে কঠিন সিদ্ধান্তে আসা দরকার। এভাবে চলতে পারে না। চলতে দেওয়া যায় না।’
ঈদের আগের দিন (৬ জুন) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি জুলাই আহত ৫৫ জনের মধ্যে মাত্র চারজন এখনো অবস্থান করছেন। তাদের সঙ্গে ভর্তি ছাড়া বহিরাগত আছেন তিনজন। অন্যরা বাড়ি চলে গেছেন। কিন্তু বাড়ি গেলেও তারা রিলিজ নেননি। তারা তাদের সুবিধামতো সময়ে এসে আবার এখানে থাকবেন।
যেভাবে হামলা-মারধরের সূত্রপাত
কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিতে গত ২৮ মে কর্মবিরতি পালন করেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জরুরি বিভাগ ছাড়া নিয়মিত অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে সব চিকিৎসাসেবা বন্ধ ছিল। যে কারণে সকাল থেকেই হাসপাতালে আসা সাধারণ রোগী ও সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কর্মীদের কথা কাটাকাটি হয়। বেলা সাড়ে ১১টার পর চিকিৎসক ও রেজিস্ট্রার মাহফুজ আলম বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে যাদের পূর্বনির্ধারিত অস্ত্রোপচারের তারিখ ছিল, তাদের পরে ফোনে ডেকে এনে অস্ত্রোপচার করে দেবেন বলে জানান। এতেও সেবাপ্রার্থীরা নিবৃত হননি। তারা হইহুল্লোড় ও হট্টগোল করতে থাকেন। চিকিৎসক ও নার্সদের দিকে তেড়ে যান। এসময় আনসার সদস্যরা নিবৃত করতে গেলে হাতাহাতি হয়। হাসপাতালের কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে মারামারিও হয়।
এরপর পুরো হাসপাতালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ভেতরের সব ওয়ার্ডের কলাপসিবল গেট আটকে তালা দিয়ে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। বিষয়টি নিজেদের জন্য আতঙ্কের বা আক্রমণাত্মক হতে পারে—এমন আশঙ্কায় উল্টো তালা ভেঙে জুলাই আহতরা লাঠিসোঁটা ও রড হাতে চিকিৎসক, কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের এলোপাতাড়ি পেটানো শুরু করেন। তাদের সঙ্গে এসে সেই হামলায় যোগ দেন পঙ্গু হাসপাতালে থাকা জুলাই আহতরাও।
এ ঘটনায় চিকিৎসকসহ ১৫ জন আহত হন। এরপর আতঙ্কে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের বেশিরভাগ দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে যান। তাদের কেউ কেউ ভেতরে আটকা পড়লে সেনাসদস্যরা গিয়ে উদ্ধার করেন। এরপরই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম। কার্যত ওইদিন থেকে পুরো হাসপাতাল জুলাই আহতদের দখলে চলে যায়। এরপর থেকে হাসপাতালে যাচ্ছেন না চিকিৎসক-নার্সসহ অন্য কর্মীরা। সেখানে এখন শুধু জুলাই আহতরা অবস্থান করছেন। সরকার রুটিনমাফিক তাদের জন্য খাবার সরবরাহ করছে।
চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর জুলাই আহতদের হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোরবান শেখ হিল্লোল বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী মানুষ কী বললো এর সঙ্গে সত্যের সংশ্লিষ্টতা নাই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এই হাসপাতালে আছি। আমরা জানি প্রত্যেকটা জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। দ্বিতীয় কথা, এখানে একটা বাহিনী আছে, আনসার বাহিনী, যারা অলটাইম এখানে নিরাপত্তায় থাকে। তৃতীয় কথা হচ্ছে এখানে শেরেবাংলা নগর থানার ওসিসহ যার টিম ছিল তারা আন্দোলনের শুরু থেকে ছিল। তারা আমরা, সবাই মিলে যদি একটা কথা বলে, আর এক গ্রুপ যদি একটা কথা বলে এর কোনো ভিত্তি নেই। এসব বাজে কথার কোনো ভিত্তি নেই।’
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
সাংবাদিক মেহেদী হাসান বাবুর বাবা নেওয়াজ আলী সর্দার আর নেই

বুড়িচংয়ে জানাজা সম্পন্ন, বিভিন্ন মহলের শোক প্রকাশ
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাসিন্দা এবং দৈনিক বিজনেস বাংলাদেশ ও ডেইলি বাংলাদেশ আপডেট পত্রিকার সম্পাদক সাংবাদিক মেহেদী হাসান বাবুর বাবা নেওয়াজ আলী সর্দার আর নেই। বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বাদ আসর কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার জরুইন গ্রামের বাড়ির ঈদগাহ মাঠে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদদীনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।
নেওয়াজ আলী সর্দার জীবদ্দশায় এলাকায় শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। তাঁর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বাবার মৃত্যুতে শোকাহত সাংবাদিক মেহেদী হাসান বাবু মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
এদিকে নেওয়াজ আলী সর্দারের মৃত্যুতে সাংবাদিক সহকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, শুভাকাঙ্ক্ষী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।
দুর্নীতিতে ‘নো কম্প্রোমাইজ’, কঠোরতায় প্রশংসায় ভাসছেন মুরাদনগরের প্রকৌশলী ফয়সল বারী

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দেখলেই কাজ বন্ধের নির্দেশ, ঠিকাদারদের কড়া হুঁশিয়ারি; বাড়ির সামনের রাস্তার কাজে শতভাগ সন্তুষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা
সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ। ঠিকাদারদের উদ্দেশে তাঁর দেওয়া কড়া হুঁশিয়ারি এবং নিম্নমানের নির্মাণকাজের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তাঁর এমন আপসহীন অবস্থানকে স্বাগত জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, নির্মাণকাজ অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী হচ্ছে কি না এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মান বজায় রাখছে কি না, এসব বিষয় নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে মুরাদনগরে দায়িত্ব পালনকালে এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারির বার্তা দিচ্ছেন উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ।
সম্প্রতি উপজেলার দরিকান্দি-ভাগলপুর সড়কসহ কয়েকটি চলমান উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শনে যান তিনি। এ সময় নির্মাণকাজে ত্রুটিপূর্ণ ইট ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি তাঁর নজরে আসে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নির্ধারিত মানের উপকরণ ব্যবহারের নির্দেশনা দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁকে ঠিকাদারদের উদ্দেশে দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, তাঁর দায়িত্বে থাকাকালে মুরাদনগরে নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। জনগণের টাকায় নির্মিত অবকাঠামোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। অনুমোদিত নকশা ও প্রকৌশলগত মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রতিটি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
এর আগেও উপজেলার একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পে নির্ধারিত শিডিউল অনুসরণ না করা এবং নকশাগত ত্রুটির অভিযোগ সামনে এলে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এই প্রকৌশলী। সংশ্লিষ্ট নির্মাণকাজে ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ার পর নিম্নমানের অংশ ভেঙে ফেলে নির্ধারিত মান অনুযায়ী পুনরায় কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর এ ধরনের পদক্ষেপ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু নির্মাণকাজের মান নয়, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিয়েও আলোচনায় রয়েছেন কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তাঁর কার্যালয়ে এক রাজনৈতিক নেতার অনাকাঙ্ক্ষিত ও উগ্র আচরণের মুখোমুখি হয়েও তিনি ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও দায়িত্বশীল আচরণ করায় সে সময় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছিল বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ বলেন, সরকারি উন্নয়নকাজের গুণগত মান বজায় রাখা আমার দায়িত্ব। জনগণের অর্থের অপচয় কিংবা নিম্নমানের কাজের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুল মতিন চৌধুরী উপজেলা প্রকৌশলীর কাজের প্রশংসা করে বলেন, আমার বাড়ির সামনের রাস্তাটির নির্মাণকাজ আমি নিজে দেখেছি। কাজের মান ও গুণগত দিক বিবেচনায় আমি শতভাগ সন্তুষ্ট। একজন প্রকৌশলী আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করলে যে ভালো উন্নয়ন সম্ভব, এই রাস্তাটি তার উদাহরণ। তাঁর মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মুরাদনগরে থাকলে এলাকার উন্নয়নকাজ আরও টেকসই ও জনবান্ধব হবে।
এলজিইডির আওতায় গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে উপজেলা প্রকৌশলীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইট, বালু, খোয়া, সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণের মান, কাজের পরিমাণ, নির্ধারিত সময়সীমা এবং অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, এসব বিষয় নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব প্রকৌশল বিভাগের। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা ত্রুটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং একই অবকাঠামো সংস্কারে আবারও সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়ক কিংবা কালভার্ট নির্মাণে ত্রুটি ও জনভোগান্তির অভিযোগ উঠলে কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজের মান বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি। ফলে তাঁর সাম্প্রতিক ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ব্যবহারকারীর মধ্যেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
মুরাদনগর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুরাদনগর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রশংসা করে অনেকেই বলছেন, সরকারি উন্নয়নকাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হলে শুধু বক্তব্য নয়, মাঠপর্যায়ে এমন কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঠিকাদারদের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে কাজের মান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সরকারি অর্থের অপচয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
মুরাদনগরের সচেতন মহলের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রকৌশলীর এই কঠোর অবস্থান যেন ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে এবং সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একই নিয়মের আওতায় আনা হয়। কারণ, সরকারি অর্থ কোনো ব্যক্তি বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের কর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। সেই অর্থে নির্মিত একটি সড়ক, সেতু কিংবা কালভার্ট নিম্নমানের হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই পারে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে।
কুমিল্লায় মাদক, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইবিরোধী অভিযানে আটক ২৯৯

এক রাতেই ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, অভিভাবকের জিম্মায় মুক্তি ১৪০ জনের
কুমিল্লায় মাদক কারবারি, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে এক রাতেই ২৯৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাকি ১৪০ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নির্দেশনায় জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে। নগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদক কারবার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে বিশেষ নজরদারি চালানো হয়। অভিযানে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সরাসরি অংশ নেন।
জেলা পুলিশ আরও জানায়, গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৮৫৭ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৯৬৪ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২ হাজার ৮৯৩ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, উঠতি বয়সী কিশোরেরা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই নিয়মিত এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধপ্রবণতা রোধে জেলা পুলিশ বদ্ধপরিকর। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।






























