বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩

জমি দখল ঘিরে উত্তেজনা

দেবীদ্বারে কলেজের জমি দখলের অভিযোগ, বিক্ষোভে নির্মাণাধীন সড়ক-প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিল শিক্ষার্থীরা

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৬:৪৮ পিএম
দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজ

দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজের ছাত্রীনিবাস সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণাধীন সড়ক ও সীমানা প্রাচীর ভেঙে দিচ্ছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ছবি: আজকের কথা

কলেজের জমি দখলের অভিযোগে উত্তাল দেবীদ্বার

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ভেঙে দেওয়া হলো নির্মাণাধীন সড়ক-প্রাচীর

কুমিল্লার দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজের ছাত্রীনিবাসের জমি দখল করে সড়ক, সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের আপত্তি এবং প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নির্মাণাধীন সড়ক ও প্রাচীর ভেঙে দিয়েছেন।

জানা গেছে, কলেজ হোস্টেল এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে ড্রেন নির্মাণের জন্য স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাকে সীমিত অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই অনুমতির সুযোগ নিয়ে কলেজের জায়গা দখল করে প্রায় সাত ফুট প্রশস্ত সড়ক, সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণ করা হয় বলে অভিযোগ করেছে কলেজ প্রশাসন।

ড্রেনের নামে জমি দখল! দেবীদ্বার কলেজে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের পাল্টা প্রতিরোধ

দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজের জমি দখলের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস।
কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ড্রেন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলেও সেই সুযোগে ছাত্রীনিবাসের জমিতে সড়ক, সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণ করা হয়েছে। অভিযোগের পরও কাজ অব্যাহত থাকায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং নির্মাণাধীন স্থাপনা ভেঙে দেয়। প্রশাসন উভয় পক্ষকে নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নিলেও কলেজের সম্পত্তি রক্ষা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল সংকট—দুই ইস্যু এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ জুন বিষয়টি জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আলোচনার জন্য ডাকা হলেও তারা উপস্থিত হননি। পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ দেবীদ্বার থানা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগের পর পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও রাতের আঁধারে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়।

এ সময় ছাত্রীনিবাসের দেয়াল ভাঙা, ৯টি নারিকেল গাছসহ একাধিক গাছ কেটে ফেলা এবং কলেজের সীমানা ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও ওঠে।

পরিস্থিতির একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে কলেজ শিক্ষার্থীরা বিএনসিসি সদস্যদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে তারা নির্মাণাধীন সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলেন এবং সড়কে বসানো ইট সরিয়ে দেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, কলেজের কোটি টাকার সম্পত্তি দখল হতে দেখে তারা চুপ থাকতে পারেননি।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কলেজটির সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আহসান পারভেজ বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ড্রেন নির্মাণে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পারি সেখানে সড়ক, গেট ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। বিষয়টি জানার পর আমরা প্রশাসনের সহায়তা নিয়েছি।”

কলেজের শিক্ষার্থী সায়মন বলেন, “ড্রেন নির্মাণের কথা বলে কলেজের জায়গা দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কাজ চালিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে নেমেছে।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিবেশী বাবুল ভূঁইয়া বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছি। খতিয়ানে তিন ফুট চলাচলের জায়গা রয়েছে। সেই জায়গা ব্যবহার করে ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।”

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা সফিউল্লাহ মানিকও একই অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি পরিবার চলাচলের চরম সংকটে রয়েছে এবং এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন জানান, কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি অনুযায়ী ৯টি নারিকেল গাছ ও কিছু কাঠগাছ কেটে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রির অর্থ সরকারি নিয়মে কলেজ তহবিলে জমা দেওয়া হয়েছে।

দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “কলেজ কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম বলেন, “ড্রেন নির্মাণের অনুমতিকে ব্যবহার করে অবৈধভাবে রাস্তা ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। কলেজের সম্পত্তি রক্ষায় আমরা আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছি।”

দেবীদ্বার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দিন জানান, জমিটি কলেজের নামে খতিয়ানভুক্ত। তবে মন্তব্য কলামে ড্রেনের জন্য তিন ফুট জায়গার উল্লেখ রয়েছে। সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশোক বিক্রম চাকমা বলেন, “উভয় পক্ষকে নিয়ে দ্রুত বৈঠক করা হবে। কলেজের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলের সমস্যা—দুই দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

ঘটনাটি নিয়ে দেবীদ্বারজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের মধ্যস্থতায় দ্রুত সমাধান না হলে কলেজের জমি দখল ও চলাচলের অধিকার নিয়ে বিরোধ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

‘বাংলাদেশের মানুষই আমার শক্তি, আমি অবশ্যই ফিরব’—শেখ হাসিনার লাইভ বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৭ এএম
‘বাংলাদেশের মানুষই আমার শক্তি, আমি অবশ্যই ফিরব’—শেখ হাসিনার লাইভ বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ

শেখ হাসিনার দেওয়া লাইভ বক্তব্যের ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ।
Fcc South কে ধন্যবাদ জানিয়ে আপা বক্তব্য শুরু করে।
বাংলাদেশকে নিয়ে যারা নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করে চলেছেন, সেই সাংবাদিকদের প্রতিও উনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

সাংবাদিকতার দায়িত্ব সত্যকে তুলে ধরা। বিশেষ করে যখন ক্ষমতাসীনরা সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে। ইতিহাসের কঠিন সময়ে সেই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজ আমি শুধু বাংলাদেশের পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবেও আপনাদের সামনে কথা বলছি। আমি এমন একজন মানুষ, যিনি সারা জীবন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে থেকেছেন। আমাকে আমার দেশ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু আমাকে কখনোই আমার জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি।

বর্তমান সংকট নিয়ে কথা বলার আগে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, জাতীয় চার নেতাকে এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদকে।

একই সঙ্গে গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার পরিবারের সেই সদস্যদের, যাদের আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হারিয়েছিলাম।

আজ আমার প্রিয় ভাই শেখ কামালের জন্মদিনও। তিনি আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুবনেতা, ক্রীড়া সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। তাঁর জীবন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সাহস, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের প্রতীক ছিল। আজ আমি তাঁকে গভীর ভালোবাসা, বেদনা ও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করছি।

গত ২ বছর ধরে আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশকে কষ্ট পেতে দেখেছি। মানুষের ঘরে, কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষাঙ্গনে ভয় ঢুকে পড়েছে। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যা আমরা গড়ে তুলেছিলাম। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

আমি ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট সম্পর্কে সত্য দিয়ে শুরু করতে চাই।

এটি কোনো শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। শুরু থেকেই আমার সরকার সংলাপ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ধৈর্যের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে চেয়েছিল। কিন্তু সংস্কারের দাবির আড়ালে সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী ছাত্রদের দাবিকে সহিংস রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা করছিল।

২০১৮ সালে ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিলাম। ২০২৪ সালে যখন হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে, তখন সরকার আপিল করেছিল, কারণ আমরা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে চেয়েছিলাম।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ছাত্রদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিলাম এবং তাদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনজন মন্ত্রীও তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।

কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত আমার পদত্যাগের একদফা দাবিতে রূপ দেওয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়। প্রকৃত ছাত্রদের আবেগকে ব্যবহার করা হয়, আর সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো তাদের আন্দোলনকে সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে।

মাহমুদুর রহমান নিজেও বলেছিলেন, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি আন্দোলন, যার পেছনে একজন মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) ছিলেন। তাঁর নিজের বক্তব্যই সত্যকে প্রকাশ করে। এটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না।

এখানে কোনো দৃশ্যমান বা দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ছিল না। নির্দেশনা আসছিল অদৃশ্যভাবে। পুরো বিষয়টি সংগঠিত ও পরিচালিত ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যালটের বাইরে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করা।

১৫ জুলাই থেকে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। শুরু হয় হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট। ব্যাপক সম্পদ ধ্বংস করা হয়।

বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়। শেখ রাসেল ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির ভবন, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন, ফ্লাইওভার, মিরপুর এক্সপ্রেসওয়ে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়, জাতীয় ডেটাবেস সেন্টার, কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হোটেল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলার কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

কারাগার থেকে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের মুক্ত করে দেওয়া হয়।

সারা দেশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয় এবং অনেককে হত্যা করা হয়। আমার সরকারের মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।

গণমাধ্যমও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। প্রায় ৫০টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা বা অগ্নিসংযোগ করা হয়। সাংবাদিকরাও নিহত হন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও সংগঠিত হামলা চালানো হয়। পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং তাদের মরদেহ ফ্লাইওভারে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

প্রায় ৪৬০টি থানায় বা পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও সদস্যরা ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে জীবন্ত দগ্ধ হন। অস্ত্র লুট করা হয়, কর্মকর্তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

নির্যাতিত পুলিশ সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩,০০০ সদস্য নিহত, হামলার শিকার, নির্যাতিত বা গুরুতর সহিংসতার শিকার হন।

তাই আমি আপনাদের একটি সহজ প্রশ্ন করতে চাই।

এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কী? যখন থানায় আগুন দেওয়া হয়, সরকারি ভবনে হামলা হয়, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়, কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং অস্ত্র লুট করা হয়, তখন রাষ্ট্রের কি জীবন ও সম্পদ রক্ষার কোনো দায়িত্ব নেই?

পৃথিবীর প্রতিটি দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো নাগরিকদের, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং নিজেদের জীবন রক্ষা করা। এটি কোনো অপরাধ নয়, আইন তাদের ওপর এই দায়িত্বই অর্পণ করেছে।

একই সঙ্গে আমি চেয়েছিলাম সত্য উদঘাটিত হোক। সে কারণেই ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আমি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করি। এর উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট , প্রতিটি মৃত্যুর তদন্ত করা, প্রতিটি সহিংস ঘটনার সত্য উদঘাটন করা এবং প্রতিটি পরিবারকে সত্য জানার সুযোগ করে দেওয়া।

আমি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি, আহতদের দেখতে গিয়েছি এবং তাদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি।

সাংবিধানিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি সমন্বিত আক্রমণ, পরিকল্পিত নির্দেশনা, সংগঠিত সহিংসতা এবং প্রচারণার মাধ্যমে পরিচালিত। এই ষড়যন্ত্র ৫ আগস্টে শেষ হয়নি। ৫ আগস্টের পর সহিংসতা রূপ নেয় রাজনৈতিক নিপীড়নের ধারাবাহিক অভিযানে।

১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর হত্যার মাধ্যমে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, তা আজও থামেনি। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ঘরছাড়া করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

দাবি করা হচ্ছে, অন্তত ১০ হাজার মানুষ নিহত বা গুম হয়েছেন। গত দুই বছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রায় ৩,৫০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আসামি করা হয়েছে। আরও ১০ লাখের বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধেই ৬০০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নারী কর্মীরা নির্যাতন, অপমান, হেফাজতে নির্যাতন ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বহু নেতা-কর্মী কারাগারেও প্রাণ হারিয়েছেন। নির্যাতন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, খাদ্য না দেওয়া, অবহেলা এবং মৌলিক অধিকার অস্বীকারের বহু অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।

এই নিপীড়ন শুধু আওয়ামী লীগের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক, এমনকি রিকশাচালক, কৃষক ও সাধারণ নাগরিকরাও হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা হত্যা মামলার আসামি হওয়ার শিকার হয়েছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, তাদের কেউই নিরাপদ নন।

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও প্রতীক ধ্বংস করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ধাপে ধাপে আক্রমণ ও ধ্বংস করা হয়েছে।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা নয়। এগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার একটি প্রচেষ্টা। প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেশের পূর্ববর্তী ইতিহাস মুছে ফেলতে “রিসেট বাটন” চাপার কথা বলেছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তিকে বদলে দিয়ে নতুন করে ইতিহাস লিখতে চায়।

দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ এখনও ভয়, সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং গভীর অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে।

এখন দেশের অবস্থা দেখুন। আমরা যে অগ্রগতি গড়ে তুলেছিলাম, তা ধ্বংস হয়ে গেছে। আর এর মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

দাবি করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৮০ শতাংশ, সেখানে তা নেমে এসেছে ২.২ শতাংশে। শিল্প উৎপাদন তীব্রভাবে কমে গেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ১৮.৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ কমে গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় ভেঙে পড়েছে। নতুন করে ২ কোটির বেশি মানুষ বেকার হয়েছেন। ৫০০-র বেশি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ধেকেরও বেশি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে রয়েছেন।

সরকার প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে চলছে। বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ৫০ শতাংশ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সময়ে জঙ্গিবাদ বাড়ছে। নারী ও শিশুরা নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন নিয়েও নিরাপদ বোধ করছেন না। চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এগুলো শুধু সংখ্যা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন শ্রমিক, একজন কৃষক, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এমন এক মা যিনি সন্তানের জন্য খাবার কিনতে পারেন না, এবং এমন এক তরুণ, যে আর ভবিষ্যতের কোনো আশা দেখতে পায় না।

কিন্তু বাংলাদেশ কী অর্জন করেছিল, সেটিও মনে রাখা প্রয়োজন। মানুষের কল্যাণই সবসময় আমার রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিল। আমার পিতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এই আদর্শের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আমিও সেই আদর্শকে পূর্ণ অঙ্গীকারের সঙ্গে ধারণ করেছি।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার পাঁচ মেয়াদে আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করেছি। ২০০৮ সালের পর টানা ১৬ বছরে আমরা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি।

আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রেখেছিলাম। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বিলাসিতা ছিল না; এগুলো ছিল জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ। আমাদের সামাজিক কর্মসূচিগুলো দান ছিল না, এগুলো ছিল মানুষের মর্যাদায় বিনিয়োগ। আমরা বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলাম। আমরা বাংলাদেশকে এশিয়ার উদীয়মান বাঘ হিসেবে পরিচিত করেছিলাম।

বাংলাদেশের সংকট শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত। তাই আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের সকল বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানাই বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও শান্তির সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়ান।

একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী সব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দশক পুনরুদ্ধার ও নবযাত্রার দশক হতে পারে, যদি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হয়।

তাই আমি স্পষ্টভাবে কয়েকটি দাবি জানাচ্ছি। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের জন্য কাজ করবে, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য নয়।

এগুলো কোনো একটি দলের দাবি নয়, বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

আমার ভাগ্যে যাই থাকুক, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে আসব। আমার প্রিয় দেশবাসী যখন কষ্টে আছে, তখন আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি জানি, আমাকে আটক করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে। সাজানো মামলার রায় কার্যকর করারও চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু ভয় কখনোই জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।

অনেক আগেই আমার জীবন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাবের ঊর্ধ্বে চলে গেছে!

আমার বিরুদ্ধে যত বাধাই আসুক না কেন!
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাও আমাকে থামাতে পারেনি।

তাই আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

আমি দেশে ফিরতে চাই, কারণ বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তি পাওয়ার অধিকার রাখে। তারা এমন একটি রাষ্ট্রের যোগ্য, যা তাদের সুরক্ষা দেবে, এমন একটি অর্থনীতির যোগ্য, যা তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে, এবং এমন একটি গণতন্ত্রের যোগ্য, যা তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে।

আমার ফিরে আসা এবং আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা ক্ষমতার প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন।

এটি দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়।

আমি একটিমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে চাই মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের জীবন আরও উন্নত করতে।

জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাদের ওপর বিশ্বাস করি, তাদের আস্থা রাখি, তাদের ভালোবাসি, এবং আমি তাদের কাছেই ফিরে আসব।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

আমাকে ধৈর্য সহকারে শোনার জন্য এবং এতটা সময় দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ।

প্রথম কলকাতার নোংরা গুজব ধূলিসাৎ: লাখো পেজ-আইডির ডিজিটাল সুনামিতে শেখ হাসিনার লাইভ দেখল কোটি মানুষ!

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ১:২৫ এএম
প্রথম কলকাতার নোংরা গুজব ধূলিসাৎ: লাখো পেজ-আইডির ডিজিটাল সুনামিতে শেখ হাসিনার লাইভ দেখল কোটি মানুষ!
সকল গুজব উড়িয়ে ভারতের নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (FCC) আয়োজিত ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে ডিজিটাল দুনিয়ায় এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক সুনামি ঘটেছে। মূলধারার গণমাধ্যমের প্রচারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই লাইভ বক্তব্য দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন কোটি কোটি মানুষ।
কলকাতার একটি অখ্যাত বা আঞ্চলিক ফেসবুক পেজের আংশিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ডেটা ব্যবহার করে ‘দর্শক কমে যাওয়া’র যে হাস্যকর প্রופাগান্ডা ও গুজব ছড়ানো হয়েছিল, তা ডিজিটাল অ্যানালিটিক্স ও ক্রসপোস্টিং ট্রাফিকের বাস্তব চিত্রে এক মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এই ডিজিটাল যুদ্ধ ও সত্য প্রকাশের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে এই ফেসবুক পোস্টে.

লাখো আইডি ও পেজের মহাসমুদ্র, কাঁপল ফেসবুক

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ দলটির কয়েক লাখ সমর্থক, নেতাকর্মী এবং দলের প্রতি সহানুভূতিশীল অন্তত ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে এই ভার্চুয়াল ভাষণটি একযোগে সরাসরি রি-স্ট্রিম ও সম্প্রচার করা হয়। ডিজিটাল বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন এক লক্ষের বেশি উৎস থেকে দর্শকরা লাইভটি ভাগ হয়ে দেখছিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ট্রাফিক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি বড় পেজে লাইভ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে গড়ে ২ থেকে ৩ লাখ বা তারও বেশি ভিউয়ার যুক্ত হন। ফলে লক্ষাধিক পেজ ও আইডির এই সম্মিলিত ভিউ (Cumulative Views) হিসেব করলে মোট দর্শক সংখ্যা সহজেই কোটির ঘর ছাড়িয়ে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ে।

‘প্রথম কলকাতা’র সস্তা গুজব ও হাস্যকর ডিজিটাল অজ্ঞতা

এদিকে কলকাতার একটি আঞ্চলিক ফেসবুক পেজ Prothom Kolkata-র একটি আংশিক স্ক্রিনশট ব্যবহার করে এই নোংরা অপপ্রচার চালানো হয় যে, লাইভ শুরু হওয়ার প্রথম ১০ মিনিটে ৪৪ হাজার দর্শক কমে গেছে। ডিজিটাল বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষাধিক তরঙ্গের এই মহাসমুদ্রের বিশালতাকে আড়াল করে মাত্র একটি পেজের ৪৪ হাজারের সাময়িক ড্রপ নিয়ে মাতামাতি করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা ও হাস্যকর দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনো একক পেজে সাময়িক দর্শক কমার অর্থ এই নয় যে সামগ্রিক দর্শক কমে গেছে, বরং লক্ষাধিক মানুষ তখন অন্য সব সমান্তরাল ও প্রধান পেজগুলোতে যুক্ত হয়ে বক্তব্য শুনছিলেন।

কড়াকড়ি ভেঙেই বিকল্প মাধ্যমে কোটি মানুষের গর্জন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর শেখ হাসিনার প্রথম এই ভার্চুয়াল উপস্থিতি ও সরাসরি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ, কৌতূহলী সমাজ ও সমর্থকদের মাঝে তীব্র উদ্দীপনা ছিল। মূলধারার দেশীয় গণমাধ্যমে সম্প্রচারে কঠোর সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে কোটি কোটি মানুষ বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের লক্ষাধিক ব্যক্তিগত আইডি ও পেজের লাইভ স্ট্রিমিংকেই তাদের মূল ভরসা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যার ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ইতিহাসে এটি অন্যতম একটি সর্বোচ্চ দর্শক সমাগমের ঘটনা হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হলো।

‘ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা, ধর্মান্ধ তোষণে তীব্র আঘাত’—শেখ হাসিনাকে নিয়ে তসলিমা নাসরিনের বিশ্লেষণ

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৪ পিএম
‘ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা, ধর্মান্ধ তোষণে তীব্র আঘাত’—শেখ হাসিনাকে নিয়ে তসলিমা নাসরিনের বিশ্লেষণ

‘কণ্ঠে ভাঙন নয়, ছিল ফেরার অঙ্গীকার; ধর্মান্ধদের তোষণেই নিজের পতনের ভিত্তি গড়েছিলেন শেখ হাসিনা’—তসলিমা নাসরিন

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতার প্রশংসার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভুল, ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় স্বীকারের আহ্বান নির্বাসিত লেখিকার

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা করেছেন বিখ্যাত লেখিকা ড. তসলিমা নাসরিন। সাম্প্রতিক ভাষণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে নির্বাসিত প্রখ্যাত লেখক ড. তসলিমা নাসরিন। বক্তব্যে তিনি একদিকে শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্পের প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে তাঁর শাসনামলের রাজনৈতিক ভুল, ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কড়া সমালোচনা করেছেন।

‘কণ্ঠে ভাঙন ছিল না, ছিল দেশে ফেরার অঙ্গীকার’

শেখ হাসিনার ভাষণ শুনে তসলিমা নাসরিন লেখেন, “দুই বছর দেশ থেকে দূরে থেকেও তাঁর কণ্ঠে ভাঙন ছিল না; ছিল দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্প। বত্রিশ বছর ধরে নির্বাসিত একজন মানুষ হিসেবে নিজের দেশে ফেরার এই আকুলতা আমি বুঝি। তাঁর দৃঢ়তা আমাকে স্পর্শ করেছে।”

বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞাকে ‘অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে তসলিমা নাসরিন বলেন, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, বিরোধী কণ্ঠ দমন গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনার কথা বলার, আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং নিজের দেশে ফেরার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সরকার বা আদালত নয়, জনগণই ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে।

স্বনামধন্য লেখিকা ড. তসলিমা নাসরিন।
স্বনামধন্য লেখিকা ড. তসলিমা নাসরিন। ছবি : দৈনিক আজকের কথা

২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার বক্তব্যের উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, আন্দোলনটি পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, আন্দোলন চলাকালে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের জন্য শেখ হাসিনার সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, “শুধু ষড়যন্ত্রের কথা বললে ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; একজন নেতার সবচেয়ে বড় সাহস।”

‘ধর্মান্ধদের তোষণই পতনের পথ তৈরি করেছে’

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপসের বিষয়টি তুলে ধরেন তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে বারবার ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, হেফাজতের দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল ও অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দেওয়া, কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ইসলামি জঙ্গিদের হাতে মুক্তচিন্তকরা নিহত হওয়ার পর তাঁদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো লেখকদের ধর্মের সমালোচনা না করার পরামর্শ দেওয়া ছিল গুরুতর রাজনৈতিক ভুল।

তসলিমা নাসরিনের ভাষায়, “ক্ষমতা রক্ষার জন্য যে ধর্মান্ধ জিহাদি অপশক্তিকে তিনি বছরের পর বছর তুষ্ট ও প্রশ্রয় দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই ছাত্রদের আন্দোলনে ঢুকে আন্দোলনটিকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে তাঁর পতন ঘটিয়েছে। তিনি শুধু ষড়যন্ত্রের শিকার নন; ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে তাঁর ধারাবাহিক আপসই সেই ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার জমি তৈরি করেছিল।”

তিনি আরও বলেন, ধর্মান্ধ শক্তিকে তুষ্ট করে সাময়িকভাবে ক্ষমতা রক্ষা করা গেলেও শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে গ্রাস করে—বাংলাদেশে তারই বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে।

স্বচ্ছ বিচার ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির আহ্বান

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেন, তিনি চান শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন। তবে সেই ফেরা যেন হত্যা, ফাঁসি বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য না হয়; বরং স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচারিক প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে হোক।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাঁর পতনের পর সংঘটিত হত্যা, লুটপাট, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারীর ওপর সহিংসতা, সাংবাদিক ও মুক্তচিন্তকদের কণ্ঠরোধ এবং ইসলামি মৌলবাদী সহিংসতারও সমানভাবে বিচার হতে হবে।

তাঁর ভাষায়, “ন্যায়বিচার বেছে বেছে করা যায় না।”

নিজের ভুল স্বীকার করেই ফিরতে হবে

প্রতিক্রিয়ার শেষাংশে বাংলাদেশকে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, শেখ হাসিনাকে শুধু ক্ষমতার দাবিদার হিসেবে নয়, বরং নিজের শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটোরই সত্য স্বীকার করতে প্রস্তুত একজন নেতা হিসেবে দেশে ফিরতে হবে।

তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা যদি অতীতের গুরুতর রাজনৈতিক ভুলগুলো স্বীকার করেন এবং ভবিষ্যতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আর কখনো আপস না করার অঙ্গীকার করেন, তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

×
CLOSE X