লেখক বাড়ছে, কমছে পাঠক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জোয়ারে দেশে কি পাঠকের চেয়ে লেখকই বেশি? উদ্বেগ জানালেন সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে লেখক, কমছে পাঠক—সাহিত্যাঙ্গনে নতুন বাস্তবতা। ছবি : আজকের কথা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জোয়ারে নেই পাঠক, আছে শুধু ঘরের ঘরে লেখক। একসময় বলা হতো, ‘ভালো বই মানুষকে সমৃদ্ধ করে, চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে।’ কিন্তু ডিজিটাল যুগে এসে সেই চিত্র যেন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন বই পড়ার চেয়ে বই লেখা, প্রকাশ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে লেখক হিসেবে পরিচিত করে তোলার প্রবণতা বেড়েছে বহুগুণ। ফলে সাহিত্যাঙ্গনে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—দেশে প্রকৃত পাঠকের তুলনায় লেখকের সংখ্যাই যেন বেশি।
প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার এবং তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রবণতা লেখালেখিকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। আগে একটি লেখা প্রকাশের জন্য পত্রিকা, সাময়িকী কিংবা প্রকাশকের দ্বারস্থ হতে হতো। এখন একটি ফেসবুক পোস্ট, ব্লগ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে লেখা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সুযোগ ইতিবাচক হলেও এর একটি নেতিবাচক দিকও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লেখকের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না পাঠকের সংখ্যা। বরং অনেকেই নিজের লেখা প্রচারে যতটা আগ্রহী, অন্যের লেখা পড়তে ততটাই অনাগ্রহী।
ফেসবুকে লেখকের ভিড়, পাঠকের সংকট
বর্তমানে ফেসবুক, ব্লগ ও বিভিন্ন সাহিত্যভিত্তিক গ্রুপে প্রতিদিন হাজার হাজার কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও মতামত প্রকাশিত হচ্ছে। লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়ার কারণে অনেকেই নিয়মিত লেখালেখিতে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, এই লেখকদের বড় একটি অংশের মধ্যে নিয়মিত পাঠাভ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বসাহিত্য, বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক কিংবা সমসাময়িক মানসম্মত সাহিত্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই অনেকেই বই প্রকাশের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে লেখার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বইমেলায় বই বাড়ছে, বাড়ছে না পাঠক
সাম্প্রতিক কয়েক বছরের অমর একুশে বইমেলার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর হাজার হাজার নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। নতুন লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইয়ের প্রচারণা, মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা অনুষ্ঠান ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেলেও প্রকৃত পাঠক ও ক্রেতার সংখ্যা সেই হারে বাড়ছে না।
প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, মেলায় আগত অনেক দর্শনার্থী বই কেনার চেয়ে ছবি তোলা, ভিডিও তৈরি কিংবা নিজের প্রকাশিত বইয়ের প্রচারণাতেই বেশি সময় ব্যয় করেন। ফলে বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশ পেলেও অধিকাংশ বইয়ের বিক্রি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায় না।
উদ্বেগ প্রকাশ করলেন সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী
বর্তমান পরিস্থিতিকে সাহিত্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী।
তিনি বলেন,
“একজন ভালো লেখক হওয়ার আগে অবশ্যই একজন ভালো পাঠক হতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেকেই পর্যাপ্ত পড়াশোনা ছাড়াই লেখক হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক-কমেন্ট সাময়িক জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো স্থায়ী সাহিত্যিক মূল্য তৈরি করতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন,
“গবেষণা, অধ্যয়ন ও গভীর চিন্তার বিকল্প নেই। নিয়মিত পাঠাভ্যাস ছাড়া মানসম্মত সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। বর্তমানে মানহীন লেখার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রকৃত মেধাবী লেখকদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে লেখার আগে বেশি করে পড়তে হবে।”
এবিএম আতিকুর রহমান বাশারের মতে, সাহিত্য কেবল আবেগ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের চিন্তা, ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির ধারক। তাই লেখকের দায়িত্বও অনেক বড়।
আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা নাকি সাহিত্যচর্চা?
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে আত্মপ্রকাশের প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। সবাই নিজের ভাবনা অন্যকে জানাতে আগ্রহী হলেও অন্যের ভাবনা গ্রহণ করার মানসিকতা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে।
এর ফলে পাঠাভ্যাসের পরিবর্তে আত্মপ্রকাশই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সম্পাদনা ছাড়াই বই প্রকাশিত হচ্ছে। বানান ভুল, ভাষাগত দুর্বলতা, তথ্যগত অসংগতি এবং বিষয়বস্তুর গভীরতার অভাবও বাড়ছে।
প্রকাশনা শিল্পের জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা
সাহিত্য সমালোচকদের মতে, মানহীন বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পাঠকের আস্থা কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রকাশনা শিল্পের জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে লেখকদেরও গবেষণা, অধ্যয়ন এবং নিয়মিত পাঠচর্চার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
উত্তরণের পথ
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি—
- নতুন লেখকদের নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
- প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মানসম্পন্ন পাণ্ডুলিপি নির্বাচনে কঠোর হতে হবে।
- সাহিত্য সংগঠনগুলোকে পাঠচক্র ও বইপাঠ আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেবল লেখার প্রচারণা নয়, ভালো বই পড়ার সংস্কৃতিও ছড়িয়ে দিতে হবে।
সাহিত্যবোদ্ধাদের ভাষ্য, একটি সুস্থ সাহিত্যচর্চার জন্য লেখক যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিবেদিত পাঠক। পাঠক ছাড়া সাহিত্য টিকে থাকতে পারে না। তাই দেশে যদি লেখকের সংখ্যা পাঠকের চেয়ে ক্রমাগত বাড়তেই থাকে, তবে ভবিষ্যতে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বাড়লেও মননশীল সমাজ গঠনের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
সব ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিতের অঙ্গীকার
জন্মাষ্টমীর আয়োজনে কায়কোবাদ, ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তায় ঐক্যের ডাক

রাজধানীতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সব সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।” তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সবার সমঅধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা তুলে ধরেন।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।
ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্বকে সামনে আনেন। তাঁর উপস্থিতিতে জন্মাষ্টমীর এ আয়োজন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় উৎসবগুলো যেন নির্বিঘ্নে ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুই স্বাস্থ্যকর্মীর হাতে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি স্বাভাবিক প্রসব

নিরাপদ মাতৃত্বে আস্থার প্রতীক নাজমা-শিরিনা
কখনো গভীর রাতে, কখনো ভোরের আগে—প্রসববেদনায় কাতর মায়ের পাশে ছুটে যেতে হয়েছে তাঁদের। দীর্ঘদিনের দক্ষতা, আন্তরিকতা ও সেবার মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে তাঁরা হয়ে উঠেছেন আস্থা ও ভরসার নাম। তাঁদের তত্ত্বাবধানে পৃথিবীর আলো দেখেছে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি শিশু।
এই দুই স্বাস্থ্যকর্মী হলেন বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়াদৌলত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নাজমা আক্তার এবং বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা শিরিনা চৌধুরী।
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নাজমা আক্তার গত ১২ বছরে প্রায় ৩ হাজার এবং শিরিনা চৌধুরী ৩৪ বছরে ৭ হাজার ৫৭৩টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন।
নাজমার সুনাম ছড়িয়েছে আশপাশেও
নাজমা আক্তার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ছয়ফুল্লাহকান্দি ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা। ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় মাসের মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তাঁর দক্ষতা ও সুনাম আরও বাড়ে।
বর্তমানে বাঞ্ছারামপুর ছাড়াও পাশের নবীনগর, নরসিংদী এবং কুমিল্লার হোমনা থেকেও প্রসূতিরা তাঁর কাছে আসেন।

স্বাস্থ্যকর্মী শিরিনা চৌধুরী ও নাজমা আক্তার স্বাভাবিক প্রসবে জেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁরা অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ও দরিয়াদৌলত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত নাজমার তত্ত্বাবধানে ২ হাজার ৪৪১টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই তিনি ২৮০টি প্রসবে সহায়তা করেছেন।
২০২২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে টানা শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হয়েছেন নাজমা। ২০২৪, ২০২৫ ও চলতি বছরেও তিনি জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন।
গত ১৬ জুন দরিয়াদৌলত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, নাজমার কক্ষে রোগীর ভিড়। প্রসববেদনা নিয়ে পাশের কক্ষে অপেক্ষা করছিলেন এক প্রসূতি। আগের দিন বিকেল থেকে পরবর্তী ১৭ ঘণ্টায় পাঁচটি স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করেন তিনি। এক দিনে সর্বোচ্চ ছয়টি প্রসব করানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। তাঁর তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত ১৫ জোড়া যমজ শিশুর জন্ম হয়েছে।
নাজমা আক্তার বলেন, দীর্ঘ সময় কাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও সুস্থ নবজাতকের জন্মের পর সেই ক্লান্তি থাকে না। বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫টি স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করেন। ২০১৯ সালের মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণের পর তাঁর দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি মানুষের আস্থাও বেড়েছে।
দরিয়াদৌলত গ্রামের আনসার আলী জানান, তাঁর এক নাতির জন্মও এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হয়েছে। নাজমার সুনাম এখন শুধু ইউনিয়ন নয়, পুরো উপজেলা ও আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
৩৪ বছরে শিরিনার ৭ হাজার ৫৭৩ প্রসব
বিজয়নগরের পাহাড়পুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে শিরিনা চৌধুরী ১৯৯২ সালের জুনে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে যোগ দেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মাসে গড়ে ৮ থেকে ৯টি এবং ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন তিনি।
হিসাব অনুযায়ী, ৩৪ বছরে তাঁর তত্ত্বাবধানে ৭ হাজার ৫৭৩টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক মাসেই ৪৭টি প্রসব করিয়ে রেকর্ড গড়েন তিনি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ২০১৯ সাল থেকে অনলাইনে প্রসবের তথ্য সংরক্ষণ করছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বিজয়নগরের ১০টি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে মোট ৫ হাজার ৫৫২টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। এর মধ্যে শিরিনা একাই করিয়েছেন ২ হাজার ৪৩৯টি।
বর্তমানে উপজেলার চারটি কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাকি ছয়টি কেন্দ্রে প্রসব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শিরিনা চৌধুরী বলেন, চাকরির শুরুর দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রসব করাতে হতো। পরে মানুষকে সচেতন করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রমুখী করা হয়। সেবার সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রসূতিদের আস্থাও বেড়েছে। দূরদূরান্ত থেকেও এখন অনেকে এখানে আসেন। অসংখ্য নির্ঘুম রাত পার হলেও সুস্থ নবজাতকের জন্মের মুহূর্তে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
স্বাস্থ্যসেবায় অবদানের জন্য শিরিনা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০১০ সাল থেকে তিনি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা এবং পাহাড়পুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রও শ্রেষ্ঠ হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা এবং ২০১৮ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার পান তিনি।
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দুই স্বাস্থ্যকর্মী
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যকর্মী শিরিনা চৌধুরী ও নাজমা আক্তার স্বাভাবিক প্রসবে জেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁরা অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগম তাঁদের প্রশংসা করে বলেন, এই দুই স্বাস্থ্যকর্মীকে সাধুবাদ ও স্যালুট জানানো উচিত। সারা দেশে স্বাভাবিক প্রসবের যে ধারা রয়েছে, তা অব্যাহত রাখার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
নাজমা আক্তার ও শিরিনা চৌধুরী জানান, কোনো প্রসূতির শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন মনে হলে তাঁরা দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানান্তরের সুবিধার্থে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখার পরামর্শও দেন তাঁরা।
দাউদকান্দির ইউএনওকে বদলি, এআই কণ্ঠে ‘নিউজ সরানোর’ দাবি—অখ্যাত পেজে অডিও, গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

বদলির পর ছড়ানো অডিও ঘিরে নতুন বিতর্ক
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরীন আক্তারকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে এ বদলি করা হলেও আদেশ জারির এক সপ্তাহ পরও তিনি দাউদকান্দি থেকে বিদায় নেননি।
গত ২৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. বর্মন হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে নাছরীন আক্তারকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়। আদেশে তাঁকে নিজ অধিক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৪ ধারার অধীনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থে জারিকৃত আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়।
তবে আদেশ জারির প্রায় এক সপ্তাহ পরও নাছরীন আক্তার দাউদকান্দিতে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে তাঁর সরকারি মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে বদলি ও এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (সাধারণ) সাইফুল ইসলাম বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ডিসি স্যার তাঁকে এ আদেশের বিষয়ে জানিয়েছেন। সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া; মন্ত্রণালয় চাইলে যেকোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতে পারে।
এদিকে ইউএনও নাছরীন আক্তারকে ঘিরে নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি অখ্যাত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক পেজে তাঁর কণ্ঠসদৃশ একটি অডিও ছড়িয়ে দিয়ে বিভিন্ন নিউজ সরিয়ে নেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। তবে অডিওটি সত্যিই নাছরীন আক্তারের কণ্ঠ কি না, কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে কণ্ঠটি তৈরি বা পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয় চাইলে যে কাউকেই বদলি করতে পারে।
অডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের কেউ কেউ এটিকে ইউএনও নাছরীন আক্তারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্র বলেও মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে বদলির খবর প্রকাশের পর এ ধরনের অডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে গত ২৩ জুলাই দাউদকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবন ভেঙে মালামাল নিলামে না দিয়ে বিক্রি করার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। তবে ওই অভিযোগের সঙ্গে নাছরীন আক্তারের বর্তমান বদলির সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্য সরকারি আদেশে উল্লেখ নেই।
সরকারি কর্মকর্তার কণ্ঠসদৃশ কোনো অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেটির সত্যতা যাচাই না করে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। ফলে অডিওটির উৎস, সত্যতা এবং এটি এআই-নির্মিত কি না—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


































https://shorturl.fm/NZ05O