

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় এক বহুমাত্রিক ও আলোচিত নাম মনিরুল হক চৌধুরী। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—যে সময়টি দেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সহিংসতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ভরপুর ছিল।
তার সভাপতিত্বের সময়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে আলোচিত ‘মুহসীন হল সেভেন মার্ডার’—যা তৎকালীন ছাত্ররাজনীতির ভয়াবহ রূপকে সামনে নিয়ে আসে। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানের নাম উঠে এলে তাকে দল থেকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ভেতরে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয় ঘেরাও ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দলের শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপ করতে হয়।
এই হত্যাকাণ্ড তৎকালীন সরকারকে বিব্রত করে এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে শফিউল আলম প্রধানের সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে আসে বলে জানা যায়।
এদিকে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ‘বাকশাল’ গঠন করলে ছাত্রলীগও রূপান্তরিত হয়ে ‘জাতীয় ছাত্রলীগ’-এ পরিণত হয়। এতে পূর্বের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কাঠামো বিলুপ্ত হয় এবং শেখ শহীদুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে মনিরুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের অধ্যায়ও শেষ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাকশাল বিলুপ্ত হলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবারও দলীয় রাজনীতির পুনর্গঠন শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ছাত্রলীগ নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করে।
তবে মনিরুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক যাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি পরবর্তীতে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৮ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৯ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন।
সময়ের পরিক্রমায় তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন এবং বর্তমানে বিএনপির একজন সংসদ সদস্য হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন।
ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে জাতীয় পার্টি হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া—মনিরুল হক চৌধুরীর এই দীর্ঘ ও বহুরূপী রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।