কী আছে সেই বাটপার ড. ইউনূসের সর্বনাশা বাণিজ্য চুক্তিতে?

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করে ভয়াবহ অসম বাণিজ্যচুক্তি। দেশের সবাইকে অন্ধকারে রেখে করা এই চুক্তি এখন বাংলাদেশের জন্য গলার ফাঁস।
ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একতরফা বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে মার্কিন পণ্যের অবাধ বাজারে পরিণত করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব।
এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে পরিণত করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক কলোনিতে। সামনে মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাজধানীতে এক সমাবেশে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে।’ সংসদে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সর্বনাশা কাজ করেছে।
তাদের অনেকে হয়তো এখন বিদেশে থাকেন। যেখানেই থাকুক, তাদের বিচার করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।’
শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে’ গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সমাবেশে আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন।
পরদিন রাজধানী এক অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্যিক চুক্তি জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালির চেয়েও বড় বাধা।
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি সই হয়। সে সময় ‘নন-ডিসক্লোজার’ অ্যাগ্রিমেন্টের দোহাই দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করে, চুক্তির কোনো শর্তই প্রকাশ করা যাবে না। তবে এর পরপরই পুরো চুক্তি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করার আড়ালে রয়েছে ভয়ংকর শুভংকরের ফাঁকি। বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চুক্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে ওয়াশিংটন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যে আবারও ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশকে ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ বা বাজার অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক চুক্তি করতে পারবে না। বাণিজ্যচুক্তিতে এমন একটি ধারা রয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্নকারী’ কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না।
চুক্তির নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পেয়েছে ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যে পাল্টা শুল্কছাড়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ৪ হাজার ৫০০টি পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্য।
এ ছাড়া ১ হাজার ৫৩৯টি পণ্যের শুল্ক চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক কমে যাবে। বাকি অর্ধেক পরবর্তী চার বছর ধরে সমানভাবে কমবে। পঞ্চম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এসব পণ্য পুরোপুরি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর বাইরে ৬৭২টি মার্কিন পণ্যের ক্ষেত্রে শুরুতে শুল্ক অর্ধেক কমবে। বাকি অর্ধেক পরের ৯ বছরে সমান ধাপে কমিয়ে দশম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সম্পূর্ণ শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপুল শুল্কছাড় বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পপণ্যের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাণিজ্য পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুল্কছাড় সুবিধার বেশির ভাগই গেছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। ২০২৫ সালের আমদানি তথ্য অনুযায়ী, যে ৬ হাজার ৭১০টি মার্কিন পণ্যে বাংলাদেশ শুল্কছাড় দিতে রাজি হয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ২ হাজার ১৬টি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আমদানি করছে। এসব পণ্যের মোট আমদানিমূল্য প্রায় ৬৫ কোটি ডলার। চুক্তি অনুযায়ী এসব পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৪১৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যেসব পণ্যে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তব রপ্তানি খুবই সীমিত। ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যের তালিকা থেকে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে মাত্র ১৪টি পণ্য। এসব পণ্যের মোট রপ্তানিমূল্য ছিল মাত্র ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
এই পণ্যগুলোতে শুল্কছাড় দিলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে সম্ভাব্য রাজস্ব ছাড় দিতে হতো ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকা। অর্থাৎ সম্ভাব্য সুবিধা ও ক্ষতির তুলনায় দেখা যাচ্ছে—বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি শত কোটি টাকার হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ছাড় কয়েক কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
অসম বাণিজ্যচুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগও খোলা রাখা হয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, খনন, উত্তোলন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও রপ্তানি করতে পারবে।
পাশাপাশি বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে। এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ওপরেও সীমা আরোপ করা হয়েছে।
ইউনূস সরকারের চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কিনতে হবে। এর মধ্যে প্রতিবছর ৭ লাখ টন হারে পাঁচ বছর ধরে গম কিনতে হবে। প্রতিবছর অন্তত ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা ২৬ লাখ টন সয়া ও সয়াজাত পণ্য এবং তুলা কেনার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়েছে।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা কমানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে আমদানি লাইসেন্সিং নীতির প্রয়োগ করতে পারবে না, যাতে সেসব পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। এতদিন মার্কিন শিল্প ও চিকিৎসাপণ্য সে দেশে অনুমোদিত হলেও বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে আবার পরীক্ষা ও বাজারজাত করার অনুমোদন নিতে হতো। বাণিজ্যচুক্তির ফলে এখন সরাসরি বাংলাদেশে বাজারজাত হবে এসব পণ্য।
অশুল্ক বাধা দূর করার নামে মার্কিন কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা–নিরীক্ষা বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা এবং অন্য মানদণ্ডকে বাংলাদেশের মানদণ্ডের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। মাংস-পোলট্রি-ডিমের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে ইউএসডিএ ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের মানদণ্ডকেই চূড়ান্ত বলে গণ্য করতে হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বলে স্বীকৃত বায়োটেকনোলজি বা জৈব প্রযুক্তি পণ্য বিনা পরীক্ষা ও বাড়তি কোনো লেবেলিং ছাড়াই বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে। জেনিটিক্যালি মোডিফায়েড পণ্য আমদানিতে এখন আর বাধা দেওয়া যাবে না, এমনকি কোনো ধরনের লেবেল যুক্ত করার বিষয়ে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা যাবে না।
চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা করতে হবে। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিকমিউনিকেশন, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে দেশটির কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের মতো সমান সুবিধা দিতে হবে। তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বিনিয়োগের ওপর কোনো সীমা আরোপ করা যাবে না। বর্তমানে দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশনে ৫০ শতাংশ পুনর্বীমা করার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বীমা কম্পানির ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
চুক্তিতে ‘রুলস অব অরিজিন’ বা পণ্যের উৎসের নিয়মসংক্রান্ত একটি ধারাও রয়েছে। এতে বলা হয়, চুক্তির সুবিধা যদি তৃতীয় কোনো দেশ বা তাদের নাগরিকদের কাছে উল্লেখযোগ্য হারে চলে যায়, তাহলে যেকোনো পক্ষ চুক্তির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে রুলস অব অরিজিন নির্ধারণ করতে পারবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের বড় একটি অংশ চুক্তিটিকে ‘অসম’ এবং ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে পুনর্বিবেচনা অথবা বাতিলের দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, এ চুক্তির ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ বা তাদের বিনিয়োগ আকর্ষণে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের শর্ত আরোপের কথাও বলা হয়েছে। এ ধরনের শর্ত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করতে হলে দুই দেশের পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগবে। তার আগে বাংলাদেশকে সংশ্লিষ্ট কিছু আইনও সংশোধন করতে হবে। তাই নতুন সরকারের উচিত আরও সময় নিয়ে চুক্তির দিশবিরোধী অংশগুলো পর্যালোচনা করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। তাই এসব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সমান সুযোগ-সুবিধা পেলে দেশীয় খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি দেশের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণও খর্ব হবে। দেশে গ্যাসসংকট থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিকে গ্যাস রপ্তানির অনুমোদন দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবাণিজ্যিক সহায়তা বা অন্য কোনো ধরনের ভর্তুকি দিতে পারবে না। এমনকি দেশের ভেতরের সব ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি ও প্রণোদনার তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে হবে। বাজারের প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে এমন ভর্তুকিও বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য জমা দিতে হবে।
নামে বাণিজ্যচুক্তি হলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। শর্ত অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সীমান্ত বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও তাদের সঙ্গে মিল রেখে ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার পাশাপাশি দেশটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া তৃতীয় দেশের কাছে তথ্য পাচার ঠেকাতে বাংলাদেশের বন্দর, টার্মিনাল, লজিস্টিক নেটওয়ার্কে বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত সফটওয়্যারের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে।
চুক্তি পর্যালোচনার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে পারবে না, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে কোনো ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে না। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের মর্যাদা হারাতে বসেছে বাংলাদেশ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করছেন, ‘বাণিজ্য চুক্তির নামে বাংলাদেশকে কার্যত আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।’
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি চরমভাবে বৈষম্যমূলক এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি। চুক্তির শর্ত দেখে আমরা হতভম্ব, স্তম্ভিত। সরকারের উচিত এই চুক্তি থেকে সরে আসা।’
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হলেও সাধারণ মানুষকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, বিষয়টি শুধু পাল্টা শুল্ক কমানোর (৩৫ থেকে ২০ শতাংশ) পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তবে বাস্তবে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত শর্তগুলো অনেক বেশি জটিল ও একপক্ষীয়। কিভাবে একটি অনির্বাচিত সরকার এই চুক্তি করতে পারল এবং এটি নির্বাচিত সরকারের কাঁধে এলো, তা বোধগম্য নয়।’
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘চুক্তির কিছু শর্ত বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা কেনাকাটা বা অন্য দেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।’
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
কুমিল্লায় মববাজদের দৌরাত্ম্য! শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপি নেতারা

ঐতিহ্য সংরক্ষণের নামে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ, বৈধ ওয়ারিশ আরমা দত্তের সাইনবোর্ড গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ-নিন্দা
কুমিল্লায় এবার ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৈতৃক বাড়ির সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মহানগর শাখার নেতাদের বিরুদ্ধে। ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবির আড়ালে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাতে নগরীর ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত বাড়িটিতে এ ঘটনা ঘটে। বাড়িটির বৈধ ওয়ারিশ আরমা দত্তের মালিকানা-সংক্রান্ত সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলার ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শনিবার সাইনবোর্ড ভাঙচুরের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি সংস্কার, সংরক্ষণ এবং সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি উঠলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে আরমা দত্ত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মালিকানা উল্লেখ করে বাড়িতে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। তিনি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একমাত্র ছেলে সঞ্জিব দত্তের মেয়ে।
সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’
ঐতিহ্য রক্ষার নামে সাইনবোর্ড ভাঙচুর
এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতাদের দাবি, বাড়িটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাদের অভিযোগ, বাড়িটি বিক্রির প্রচেষ্টা হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে এবং পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাড়ি বিক্রি ঠেকাতেই সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে তারা জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতারা বাড়িটিতে গিয়ে প্রথমে স্থাপনাটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। পরে তাঁরা সাইনবোর্ডটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়। এটি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানাবেন তাঁরা।
শনিবার মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ‘একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে আমরা সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণ নিয়ে প্রতিহত করা হবে।’
‘আমার সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার’
এদিকে আরমা দত্ত বলেন, ‘এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানেন। তাই এ বাড়ির জায়গা আমি কী করব, রাখব নাকি বিক্রি করব—সেটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি থাকলেও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে এভাবে হস্তক্ষেপের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনো সম্পত্তি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করলেই কি তার মালিক বা বৈধ ওয়ারিশের অধিকার উপেক্ষা করে কেউ নিজ উদ্যোগে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন? সংরক্ষণের দাবি থাকলে তা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলছেন তাঁরা।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলার বিষয়ে তাঁরা কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ও তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। দিলীপ কুমার দত্তের মেয়ে আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।
খাল পরিষ্কারে নেমে কাদায় আটকে গেলেন ইউএনও, তবু থামেননি কাজ

সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষা না করে স্বেচ্ছাশ্রমে দুই কিলোমিটার খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ, ইউএনওর সঙ্গে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী
বরিশালের উজিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকা একটি খাল পরিষ্কারের অভিযানে নিজেই নেমে পড়েন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে গিয়ে একপর্যায়ে কাদায় আটকে যান তিনি। পরে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে উদ্ধার করেন। তবে এতে দমে না গিয়ে আবারও খাল পরিষ্কারের কাজে যোগ দেন তিনি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উজিরপুর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ খালে এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিন বরিশালের সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মসূচিতে ইউএনওর পাশাপাশি শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী, স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজের সদস্যরা অংশ নেন।
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টা চলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। এ সময় খাল থেকে কচুরিপানা, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য অপসারণ করা হয়। এতে খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় খালটি ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। কচুরিপানা ও প্লাস্টিক বর্জ্যে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে খালটির এমন দুরবস্থা চলছিল।
অভিযানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ইউএনও মো. আলী সুজার সরাসরি অংশগ্রহণ। বিডি ক্লিনের টি-শার্ট পরে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে তিনিও খালের ময়লা পরিষ্কারে নেমে পড়েন। একপর্যায়ে কাদায় আটকে গেলে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে তুলে সহযোগিতা করেন। এরপর আবারও কাজে যোগ দেন তিনি।
ইউএনওর খাল পরিষ্কারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে একজন সরকারি কর্মকর্তার সরাসরি অংশগ্রহণকে দায়িত্ববোধ, জনসম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বিডি ক্লিনের বিভাগীয় সমন্বয়ক জাহেদ ইরফান বলেন, উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজার আহ্বানে দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্ন খালটি পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় তরুণ-তরুণীসহ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ইউএনও নিজে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করায় সবাই আরও উৎসাহিত হয়েছেন।
ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, খালের পাশের বাসিন্দাদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্যে পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় না থেকে সম্মিলিত স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে উদ্যোগী হলে সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান তারই একটি উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে অনেকেই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তারা মাদকাসক্তি ও মোবাইল ফোনের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে থেকে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ সফটওয়্যার, সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে?

১০ বছর ধরে চলা বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পে ব্যয় ৮০ কোটি টাকা, অধিকাংশ প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত; প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ ও সমৃদ্ধ করতে ১০ বছর ধরে কাজ করছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এ সময়ের মধ্যে ১২টি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এসব প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১৫৮ কোটি টাকা। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় মোট ১৬টি সফটওয়্যার, প্রযুক্তি উপকরণ ও সেবা তৈরির পরিকল্পনা ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে সব সেবা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত কিংবা সহজলভ্য হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে বাংলা ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে ছবি বা নথি থেকে লেখা শনাক্ত ও রূপান্তরের ওসিআর, অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান যাচাই, ব্যাকরণ সংশোধন, ভাষা অনুবাদ, বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ড, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল কনভার্টার এবং ইশারাভাষা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দিতে তৈরি করা হয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট।
ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেবাভেদে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য তৈরি ‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবটে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অনুরোধ আসে। বাংলা ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে মাত্র ২৭৫টি। অন্যদিকে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসে। কাগজডটএআই প্ল্যাটফর্মের ওসিআর সেবায় দৈনিক অনুরোধের সংখ্যা প্রায় ৫০টি।
প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করে দেখা গেছে, বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটি তুলনামূলক ভালো ফল দিচ্ছে। তবে বড় আকারের অডিও ফাইল থেকে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) সক্ষমতা রয়েছে, তা দিয়ে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান অবকাঠামোয় একসঙ্গে পাঁচ থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারী সেবা নিতে পারলেও চাহিদা বাড়লে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বৃহৎ পরিসরে সেবা চালু রাখতে অতিরিক্ত জিপিইউ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন।
৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব
প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও তথ্য সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অফিস ব্যবস্থাপনা, সভা-সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা ও পরিচালন কার্যক্রমে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, তৈরি করা প্রযুক্তিগুলোর কোনটিতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে কাজের মানের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় শুধু সফটওয়্যার তৈরি নয়, বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার তৈরির কাজও করা হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আট হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টা এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও এবং ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে সমালোচনা
প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আগের সরকারের সময় নেওয়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাদ দেওয়া এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হলেও এর ব্যয় কমানো হয়নি।
আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু প্রযুক্তি তৈরি হলেও সব কটির কার্যকারিতা সমান নয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাছে সেবাগুলো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এসব প্রযুক্তিকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে এনে আরও ব্যবহারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেসব কার্যক্রম অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
অতীতের প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইসিটি খাতে ২১টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রকল্পগুলো পর্যালোচনায় ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বেশ কিছু প্রকল্পে উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম এবং আইসিটি বিভাগের আওতাবহির্ভূত কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দিলে প্রায় ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইসিটি খাতের প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, অতীতের প্রকল্পগুলোর কর্মপদ্ধতি ও ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়ানো হলে পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে ১০ বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তিগুলোর বাস্তব উপযোগিতা, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এসব প্রযুক্তি সচল রাখা এবং জনগণের ব্যবহার উপযোগী করার দায়িত্ব কে নেবে, সেটিও এখন বড় বিবেচ্য বিষয়।

































