বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রবাসীদের জন্য সুখবর! ৩২ বছর পর চালুর পথে কুমিল্লা বিমানবন্দর

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৫ এএম
আবারও উড়বে বিমান! ৩২ বছর পর কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ

আবারও উড়বে বিমান! ৩২ বছর পর কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ। ছবি : আজকের কথা

৩২ বছর পর চালুর পথে কুমিল্লা বিমানবন্দর!

সরকারের মহাপরিকল্পনায় আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবন, প্রবাসী অধ্যুষিত কুমিল্লায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার

দীর্ঘ ৩২ বছর পর আবারও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কুমিল্লা বিমানবন্দর। সরকারের আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় সচল করার মহাপরিকল্পনায় স্থান পেয়েছে দেশের অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত এই জেলার বিমানবন্দর। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হলে এখান থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় তিন দশক ধরে কুমিল্লা বিমানবন্দরে কোনো বিমান ওঠানামা না করলেও এর প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রয়েছে। বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত সরকারি রাজস্বও আদায় হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতে, রানওয়ের কার্পেটিং, ফায়ার সার্ভিস সুবিধা উন্নয়ন এবং বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য টাওয়ারে আধুনিক ভিএইচএফ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনায় বড় কোনো বাধা থাকবে না।

৩২ বছর পর জেগে উঠছে কুমিল্লা বিমানবন্দর, চালুর উদ্যোগে সরকারের মহাপরিকল্পনা
৩২ বছর পর জেগে উঠছে কুমিল্লা বিমানবন্দর, চালুর উদ্যোগে সরকারের মহাপরিকল্পনা। ছবি : আজকের কথা

সরকার দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, পর্যটন খাতের বিকাশ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই তালিকায় কুমিল্লা বিমানবন্দরও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কুমিল্লাকে দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে কুমিল্লা থেকে বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৬৬১ জন। একই সময়ে সারাদেশ থেকে বিদেশে গেছেন ৭৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪৯ জন, যার প্রায় ৯ শতাংশই কুমিল্লার

বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৫ সালে কুমিল্লা থেকে বিদেশে যান ৪০ হাজার ৫২৫ জন, ২০১৬ সালে ৮৬ হাজার ৩৩৫ জন, ২০১৭ সালে ১ লাখ ৪ হাজার ৭০৯ জন, ২০১৮ সালে ৬২ হাজার ৪৪৫ জন, ২০১৯ সালে ৬৫ হাজার ৯৪১ জন, ২০২০ সালে ২৪ হাজার ১৮৯ জন, ২০২১ সালে ৬৮ হাজার ১৬৭ জন, ২০২২ সালে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৯৯ জন, ২০২৩ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৫১ জন এবং ২০২৪ সালে ৯২ হাজার ১০০ জন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু হলে শুধু প্রবাসীদের যাতায়াতই সহজ হবে না, বরং জেলার শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে ঢাকা বিমানবন্দরের ওপর যাত্রীচাপ কমাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু হলে শুধু কুমিল্লা নয়, পুরো বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্প-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে। দেশের অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে। আমি নিজেও কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার সন্তান। তাই এই বিমানবন্দর চালু হওয়া আমার কাছে উন্নয়নের পাশাপাশি আবেগেরও বিষয়। সরকারের এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে প্রবাসী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।

— কেএম মুজিবুল হক

চেয়ারম্যান, টিএএস এভিয়েশন গ্রুপ | অনারারি কনসাল জেনারেল (ইয়েমেন)
0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

‘সাংবাদিকতা আমার কাছে পেশা নয়, নেশা’— অর্ধশতকের পথচলায় দেবীদ্বারের প্রবীণ সাংবাদিক আতিকুর রহমান বাশার

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৩:০০ এএম
‘সাংবাদিকতা আমার কাছে পেশা নয়, নেশা’— অর্ধশতকের পথচলায় দেবীদ্বারের প্রবীণ সাংবাদিক আতিকুর রহমান বাশার

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৫০ বছরের নিরলস সাংবাদিকতা; অপসাংবাদিকতা নিয়ে উদ্বেগ, ইতিহাসচর্চায় কাটাতে চান জীবনের বাকিটা সময়

সাংবাদিকতা আমার কাছে কোনো পেশা নয়; এটি একটি আদর্শ, একটি দায়বদ্ধতা। কাকতালীয়ভাবে এই পেশায় এসেছিলাম, কিন্তু আর বের হতে পারিনি।

অর্ধশতকের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার

দেবীদ্বার পৌর এলাকার ভূষণা গ্রামের সন্তান এবিএম আতিকুর রহমান বাশারের জন্ম ১৯৬৩ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর মুন্সেফবাড়িতে। মাত্র দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৭৯ সালে সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয়।

সে সময় তৎকালীন ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন, লেখক ও কলামিস্ট কাজল দত্ত তাঁকে কুমিল্লার দীর্ঘদিনের সমস্যা ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ নিয়ে প্রতিবেদন লিখতে উৎসাহ দেন। সাংবাদিকতায় কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি প্রথমে বিষয়টি রচনার আকারে লিখলেও পরে কাজল দত্ত ও কুমিল্লা বঙ্গ বিদ্যালয়ের (কুমিল্লা হাই স্কুল) শিক্ষক আব্দুল খালেক মোল্লার সম্পাদনায় সেটি সংবাদের রূপ পায় এবং ‘নতুন বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর প্রতিবেদনটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি ‘যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন।
মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি ‘যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন। ছবি : আজকের কথা

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। পরে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ ও বরাদ্দ আসে। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন উপমন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সাবেক সচিব এবিএম গোলাম মোস্তফার দায়িত্বকালে গোমতী বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হয়।

তবে এই ঐতিহাসিক ঘটনার কৃতিত্ব নিজের নয় বলে উল্লেখ করেন আতিকুর রহমান বাশার। তাঁর ভাষায়, “আমি শুধু লেখাটি লিখেছিলাম। প্রকৃত কৃতিত্ব কাজল দত্ত ও খালেক মাস্টারের, যাঁরা আমার লেখাকে সংবাদে রূপ দিয়েছিলেন।”

মানুষের অধিকারের পক্ষে অর্ধশতকের লড়াই

দীর্ঘ ৫০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে সাধারণ মানুষের অধিকার, অসহায় মানুষের দুর্ভোগ এবং সমাজ-রাষ্ট্রের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরাকেই নিজের মূল দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন তিনি।

FB IMG 1785874959019
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও একনিষ্ট সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একতা, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজকের কাগজদৈনিক ভোরের কাগজে কাজ করেছেন। পরে টানা ১২ বছর দৈনিক প্রথম আলো-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠএর দেবীদ্বার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দেবীদ্বার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা

১৯৮০ সালে তিনি দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর হাত ধরেই দেবীদ্বারে বহু সাংবাদিকের পথচলা শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, বর্তমানে জীবিত সাংবাদিকদের মধ্যে তিনিই দেবীদ্বারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

অপসাংবাদিকতা নিয়ে ক্ষোভ

বর্তমান সাংবাদিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সাংবাদিকতা জাতির চতুর্থ স্তম্ভ এবং সাংবাদিক জাতির বিবেক। ৯০-এর দশকের পর গণমাধ্যমের বিস্তার ঘটলেও ২০০১ সালের পর অপসাংবাদিকতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এখন প্রকৃত সাংবাদিকের চেয়ে অপসাংবাদিকের সংখ্যাই বেশি।”

তিনি অভিযোগ করেন, অনেকেই শুধু পরিচয়পত্র, ডায়েরি ও কলম নিয়ে বিভিন্ন অফিসে দালালি করেন, অথচ সংবাদ লেখার ন্যূনতম দক্ষতাও তাদের নেই। এমনকি একটি সাধারণ শোকসংবাদও অনেকের পক্ষে লেখা সম্ভব হয় না। এসব কর্মকাণ্ডে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অপসাংবাদিকতা রোধে প্রাথমিক স্তর থেকেই সাংবাদিকতা বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা চালুর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

FB IMG 1785875008446
নিজ পরিবারের সাথে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়াই সাংবাদিকতার পরিচয় নয়

প্রেসক্লাবের সদস্যপদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাংবাদিক হতে প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তিনি কোন গণমাধ্যমে কাজ করেন এবং তাঁর সংবাদ নিয়মিত প্রকাশিত হয় কি না।”

তিনি জানান, বর্তমানে দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে ২৭ জন সদস্য রয়েছেন। এখানে দাতা, সহযোগী ও মূল—এই তিন ধরনের সদস্যপদ রয়েছে। মূল সদস্য হতে হলে অবশ্যই পেশাদার সাংবাদিক হতে হয়।

গবেষণা ও বই প্রকাশের পরিকল্পনা

ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিকতায় সবসময় পেশাগত নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানান আতিকুর রহমান বাশার।

তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতার কারণে বহুবার সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সত্য অনুসন্ধানের দায়বদ্ধতা এবং পেশার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে বারবার মাঠে ফিরিয়ে এনেছে।

জীবনের অবশিষ্ট সময় দেবীদ্বারের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণামূলক লেখালেখিতে ব্যয় করতে চান তিনি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখাগুলো একত্র করে বই আকারে প্রকাশের কাজও এগিয়ে নিচ্ছেন।

FB IMG 1785874744598
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হিসেবে বিভিন্ন কাজের বর্ননা করছেন সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়া বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লার ‘আপনজন সম্মাননা’, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ, কুমিল্লা প্রদত্ত নিরাপদ সাংবাদিকতা ও বিশেষ অবদানের সম্মাননাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন।

তনু হত্যা: জামিনে কারামুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৮ পিএম
তনু হত্যা: জামিনে কারামুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর

হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তি, তদন্ত অব্যাহত; ডিএনএ পরীক্ষা ও পলাতকদের গ্রেপ্তারে তৎপর পিবিআই

আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র সন্দেহভাজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা প্রায় সোয়া ৭টায় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান।

তিনি জানান, গত রোববার হাইকোর্ট হাফিজুর রহমানকে জামিন প্রদান করেন। পরে মঙ্গলবার কুমিল্লা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছালে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এর আগে গত ২১ এপ্রিল রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ বাসা থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। গ্রেপ্তারের তিন মাস ১৪ দিন পর তিনি কারামুক্ত হলেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারের পরদিন হাফিজুর রহমানকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে ঢাকায় পিবিআইয়ের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

সোহাগী জাহান তনু
সোহাগী জাহান তনু। ছবি : আজকের কথা

ডিএনএ পরীক্ষায় নতুন অগ্রগতি

পিবিআই সূত্র জানায়, তনুর পরিধেয় পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনার বিশ্লেষণে একাধিক পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এসব প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দুই সন্দেহভাজনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাবেক সৈনিক মো. জাহিদুল ইসলাম (৪১) এবং ফয়সাল আহমেদ ওরফে রাব্বী (৩২)-এর ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দেন।

দুই পলাতকের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ

মামলায় পলাতক দুই সন্দেহভাজন—সার্জেন্ট (অব.) জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ এবং সৈনিক শাহীন আলমের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিবিআই জানায়, ঘটনার সময় সার্জেন্ট জাহিদ কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে। অন্যদিকে সৈনিক শাহীন আলম কর্মরত ছিলেন ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে। তার বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। বর্তমানে দুজনই পলাতক রয়েছেন।

(অবঃ) ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান
(অবঃ) ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান। ছবি : আজকের কথা

তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের মাধ্যমে হাফিজুর রহমানের জামিনের বিষয়টি জেনেছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য সন্দেহভাজনকে আটক এবং তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তনুর নমুনার মিল পাওয়া গেছে কি না—এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

হতাশ তনুর পরিবার

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্ত হওয়ার খবর জেনে তারা হতাশ হয়েছেন। তার ভাষ্য, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই প্রধান সন্দেহভাজনের জামিনে মুক্তি বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।

আট বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

প্রথমে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং সিআইডি দীর্ঘ সময় তদন্ত করলেও হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাক থেকে পাওয়া নমুনায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে সে সময় সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়নি।

২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে সংস্থাটি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর চেম্বারে ‘মব’ হামলা: সারা দেশে আইনজীবীদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৮ পিএম
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর চেম্বারে ‘মব’ হামলা: সারা দেশে আইনজীবীদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর চেম্বারে ‘মব’ হামলা: সারা দেশে আইনজীবীদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়

দেশে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের লক্ষ্য করে একের পর এক ‘মব জাস্টিস’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতার হামলা), হয়রানিমূলক মামলা ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি এই ধরনের চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন (Farzana Yeasmin)।

গতকাল এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি তার চেম্বারে ঘটে যাওয়া অতর্কিত হামলা ও শারীরিক নির্যাতনের বিবরণ দিয়ে বিচার দাবি করেছেন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

​চেম্বারে হামলা ও শারীরিক নির্যাতন

তিনি আরও জানান, হামলাকারীরা তার চেম্বারের সদস্যদের ওপর সরাসরি চড়-থাপ্পড় ও কিল-ঘুষি মেরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে। একই সাথে অকথ্য ভাষায় হুমকি-ধামকি দিয়ে চেম্বার বন্ধ করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটির বিষয়ে তিনি আইনগত পদক্ষেপ ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।

নেটিজেনদের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ

আইনজীবীর এ পোস্টটি মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও লাইক-কমেন্টের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ এই অন্যায় ও ‘মব কালচার’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পোস্টটির কমেন্ট সেকশনে হাজারেরও বেশি মানুষ ‘তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ’ লিখে দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনজীবীদের নিরাপত্তার চরম অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন (Farzana Yeasmin)।
চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন (Farzana Yeasmin)। ছবি : আজকের কথা

মব ভায়োলেন্স ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে দেশে আইনজীবী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

  • যত্রতত্র মব ভায়োলেন্স: স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে আদালত প্রাঙ্গণ—সব জায়গায় আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে একশ্রেণীর দুর্বৃত্ত ‘মব’ সৃষ্টি করে নিজেদের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।
  • বিচারে বাধা ও হয়রানি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পেশাগত দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। মামলা-হামলার ভয়ে সত্য কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না সাধারণ নাগরিকরাও।
  • অহেতুক ও গায়েবি মামলা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও গণহারে ও বিতর্কিতভাবে মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে মৃত ব্যক্তি কিংবা প্রবাসীদের নামও বাদ যাচ্ছে না।
  • জনজীবনের দুর্দশা: একদিকে মব জাস্টিসের ভয়, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দাম, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও সার্বিক অর্থনৈতিক সংকট মিলিয়ে জনজীবন আজ বিপর্যস্ত।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর ওপর এহেন হামলার পর দেশের সচেতন মহল ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা আশু পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এখনই যদি মব ভায়োলেন্স এবং পেশাজীবীদের ওপর হামলা শক্ত হাতে দমন না করা হয়, তবে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

×
CLOSE X