বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফেসবুক পোস্টে পাল্টা বক্তব্য

‘প্রমাণ থাকলে প্রকাশ করুন’— জুলকারনাইন সায়েরকে খোলা চিঠিতে মেহেদী হাসান বাবুর জবাব

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী প্রকাশিত: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ৪:৩৬ পিএম
মেহেদী হাসান বাবুর জবাব

ফেসবুক পোস্টে অভিযোগের জবাব দিলেন মেহেদী হাসান বাবু। ছবির গ্রাফিতি দৈনিক আজকের কথা

ফেসবুক পোস্টে অভিযোগের জবাব দিলেন মেহেদী হাসান বাবু

সম্পাদক ও প্রকাশক মেহেদী হাসান বাবুকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা একটি পোস্টের জবাব দিয়েছেন তিনি। শনিবার (৩১ মে) নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত Zulkarnain Saer-এর একটি পোস্টের প্রতিবাদ জানান মেহেদী হাসান বাবু।

ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তথ্য-প্রমাণবিহীন এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। তিনি বলেন, অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

মেহেদী হাসান বাবুর ভাষ্য অনুযায়ী, পোস্টটি দেখার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জুলকারনাইন সায়েরের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং নিজের আপত্তির কথা জানানোর উদ্যোগ নেন। তবে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, একজন আন্তর্জাতিক সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য যাচাই ছাড়া এ ধরনের অভিযোগমূলক পোস্ট প্রত্যাশিত নয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, শুধুমাত্র কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ছবি থাকা বা পরিচিতি থাকার ভিত্তিতে কাউকে কোনো অপরাধ বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যৌক্তিক নয়।

মেহেদী হাসান বাবু তার পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, তিনি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন এবং নিয়মিত কর প্রদান করে আসছেন। তার প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ কাজ করছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

পোস্টে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা “ফ্যাসিবাদের দোসর” আখ্যারও প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, অতীতে একটি রাজনৈতিক মামলায় আইনি সহায়তা দিতে গিয়ে নিজেও হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং প্রায় এক মাস কারাবন্দি ছিলেন। এ সংক্রান্ত নথিপত্র তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

এছাড়া কিছু ব্যক্তির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করে মেহেদী হাসান বাবু বলেন, সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে তার কখনো সাক্ষাৎ পর্যন্ত হয়নি। তাই অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।

পোস্টের শেষাংশে তিনি জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ তার নামে দেশের কোনো থানায় বিরূপ অভিযোগ নেই মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে, যার কপিও তিনি সংযুক্ত করেছেন।

মেহেদী হাসান বাবু লেখেন, “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই স্বাধীনতা যেন তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও ন্যায়সংগত হয়, সেটিও সমানভাবে জরুরি।”

তার এই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেডের আয়োজনে পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

আজকের কথা ডেস্ক প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৪ এএম
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেডের আয়োজনে পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং পল্লী চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেডের উদ্যোগে হাসপাতালের কনফারেন্স হলে ২৯ জুলাই বুধবার দিনব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কর্মশালায় প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জন ডা. এটিএম রেজাউল করিম। প্রশিক্ষক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম. এম. আলম সাদী, ব্লাড ব্যাংক ও ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. তানজিলা তাবিব চৌধুরী, ইমার্জেন্সি অ্যান্ড অ্যাক্সিডেন্ট বিভাগের ইনচার্জ ডা. এনামুল কবির তানভীর, এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স মেহেদী হাসান মুরাদ ও শ্রাবন্তী দে।

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় Advanced Trauma Life Support (ATLS), ‘বুকে ব্যথা মানেই কি হার্টের ব্যথা?—প্রাথমিক করণীয়’, রক্ত পরিসঞ্চালনের ক্ষেত্রে সাধারণ ত্রুটি ও প্রতিকার, সাধারণ রোগে ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার, হ্যান্ড ওয়াশিংয়ের গুরুত্ব, নেবুলাইজার, ইনহেলার ও অক্সিজেন ডিভাইসের সঠিক ব্যবহার, প্যারেন্টেরাল প্রসিডিউর ও অ্যাসেপটিক টেকনিক, এবং প্রোফাইল্যাক্সিস ও নন-ফার্মাকোলজিক্যাল পরামর্শ বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক পল্লী চিকিৎসক সমবায় সমিতির সভাপতি মাওলানা রফিকউল্লাহ এবং বর্তমান সভাপতি পল্লী চিকিৎসক নাসির।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পল্লী চিকিৎসক রাশেদুল মনোয়ার, মাহমুদুল হাসান, মামুনুর রশিদ, মুহসিন, মুহিউদ্দিন, বাবলু, এরশাদ এবং লিটন কুমার শর্মাসহ বিভিন্ন এলাকার পল্লী চিকিৎসকবৃন্দ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেডের মার্কেটিং অ্যান্ড ব্র্যান্ড বিভাগের ম্যানেজার জাহেদুল ইসলাম।

বক্তারা বলেন, দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পল্লী চিকিৎসকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাঁদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, রোগ নির্ণয় ও প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষ আরও নিরাপদ, কার্যকর ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং পল্লী চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হবে।

অনুষ্ঠানের সার্বিক সমন্বয় ও সহযোগিতায় ছিলেন পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেডের মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আব্দুস সোবহান, রাজ্জাকুল হায়দার এবং কর্পোরেট অফিসার হেলাল পারভেজ।

সরকারি সার কালোবাজারির অভিযোগে শেরপুরে ২০ ডিলারের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা

আজকের কথা ডেস্ক প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ২:৪২ পিএম
সরকারি সার কালোবাজারির অভিযোগে শেরপুরে ২০ ডিলারের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা

সরকারি সার বরাদ্দের পর কালোবাজারে বিক্রি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং সরকারের কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে শেরপুর সদর উপজেলার ২০ জন সার ডিলারের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪-এর আওতায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দায়ের হওয়া এ মামলার বাদী শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, সরকারি সার বিতরণে অনিয়ম ও কৃষকদের হয়রানির অভিযোগে দীর্ঘ তদন্তের পর এ মামলা করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ২৪ জুন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জাহানকে সঙ্গে নিয়ে শেরপুর শহরের নিউমার্কেট, রঘুনাথ বাজার, নতুন বাসস্ট্যান্ডসহ সদর উপজেলার বিভিন্ন সার ডিলারের দোকানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ডিলারদের বিক্রয় রেজিস্টার ও ক্যাশ মেমো জব্দ করে যাচাই-বাছাই করলে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়।

তদন্তে দেখা যায়, অভিযুক্ত ডিলাররা সরকারি বরাদ্দের ৪ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৮২১ মেট্রিক টন ডিএপি, ১৩৪ মেট্রিক টন টিএসপিসহ বিভিন্ন ধরনের সার অধিক মুনাফার আশায় কালোবাজারে বিক্রি করেছেন। এসব সারের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকারও বেশি

এজাহারে আরও বলা হয়, সার কালোবাজারে বিক্রির ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়। এতে কৃষকদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হতে হয়েছে এবং সরকারের কয়েক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

মামলার আসামিরা হলেন— মো. রাসেদুল ইসলাম, সুফিয়া বেগম, মো. রফিকুল ইসলাম, সুবর্ণা সাহা রায়, মীর দেলোয়ার হোসেন, মরিয়ম আক্তার মুন্নি, মো. ফরহাদ আলী, ইলিয়াস আলী, তাপস নন্দী, কামরুন নাহার হাসেম, সিরাজুল ইসলাম, ছামিদুল ইসলাম ফারাজী, বোরহান উদ্দিন, রেজাউল করিম, মাজাহারুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মনিরুজ্জামান মনির, প্রশান্ত সাহা, মো. রতন মিয়া ও মো. বাদশা মিয়া।

শেরপুর সদর থানায় মামলা নং-২৫(১), তারিখ ২২ জুলাই ২০২৬ হিসেবে মামলাটি বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪-এর আওতায় রুজু হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সরকারি বরাদ্দের সার বিতরণে অনিয়ম ও কালোবাজারির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপমহাদেশের গর্ব কানাই লাল শীল, অথচ জন্মভিটা আজও অবহেলায় ধুঁকছে

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১:০৪ পিএম
উপমহাদেশের গর্ব কানাই লাল শীল, অথচ জন্মভিটা আজও অবহেলায় ধুঁকছে

বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে দোতারার সুরের কথা উঠলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি দোতারা বাদক, লোকশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার কানাই লাল শীলের নাম। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের মতো গুণীজনদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি বাংলা লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন অনন্য অবদানে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পীর জন্মভিটা আজও অবহেলা আর অযত্নে পড়ে আছে। নেই কোনো স্মৃতি জাদুঘর, সংগীতচর্চা কেন্দ্র কিংবা স্থায়ী সংরক্ষণ উদ্যোগ। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত অমূল্য নিদর্শন।

জন্মভিটায় নীরবতা, হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কানাই লাল শীলের বাড়ির পরিবেশে নেমে এসেছে নীরবতা। বাড়ির পাশে একটি জরাজীর্ণ সিমেন্টের স্মৃতিফলক ছাড়া তাঁর স্মৃতির তেমন কোনো চিহ্ন নেই। ধুলা-ময়লায় ঢাকা ফলকটি সংস্কারের অভাবে নষ্ট হওয়ার পথে।

যে তমাল গাছের নিচে বসে তিনি দোতারার সুরে মানুষকে মুগ্ধ করতেন, সেই গাছও আর নেই। ঘরের ভেতরে তাঁর একটি ছবি ও কয়েকটি বই থাকলেও সেগুলোও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি ঝোঁক

১৮৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর ফরিদপুরের লস্করপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কানাই লাল শীল। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতাকে হারালেও ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। আট বছর বয়সে বেহালার হাতেখড়ি, পরে দোতারার প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে লোকসংগীতের কিংবদন্তিতে পরিণত করে।

দোতারার সুরে ছড়িয়ে পড়ে খ্যাতি

দরবেশ দাণ্ড শাহের মাজারে কিংবদন্তি দোতারা বাদক তরবন সরকারের পরিবেশনা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন কানাই লাল শীল। এরপর কবিগান, যাত্রাপালা, গাজীর গান, কীর্তনসহ বিভিন্ন ধারার লোকসংগীতে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন।

জসীমউদ্দীন, নজরুল ও আব্বাসউদ্দীনের ঘনিষ্ঠ সহচর

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের হাত ধরেই কলকাতায় লোকসংগীতের বড় পরিসরে প্রবেশ করেন কানাই লাল শীল। সেখানে আব্বাসউদ্দীন আহমদের সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি গান লেখা ও সুর করা শুরু করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানেও নিয়মিত দোতারা বাজিয়েছেন তিনি।

পরে অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা এবং দেশভাগের পর ঢাকা বেতারে দীর্ঘদিন নিয়মিত শিল্পী হিসেবে কাজ করেন।

কালজয়ী গানের স্রষ্টা

দোতারা বাদক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন দক্ষ গীতিকার ও সুরকার। তাঁর লেখা ও সুর করা গান পরিবেশন করেছেন শচীন দেব বর্মন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আব্দুল আলীম, ফেরদৌসী রহমানসহ বাংলা সংগীতের বহু কিংবদন্তি শিল্পী।

একুশে পদকে সম্মানিত

১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন কানাই লাল শীল। বাংলা লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে (মরণোত্তর) তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

নাতির ঘরে টিকে আছে স্মৃতির শেষ আশ্রয়

বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে কুমোত কান্ত শীলের ছেলে বাদল চন্দ্র শীল পৈতৃক বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

তিনি বলেন, “বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস পেয়েছি। প্রশাসনের অনেকেই আসার কথা বলেছিলেন, কিন্তু কেউ আসেননি। এখানে একটি সংগীতচর্চা কেন্দ্র, লাইব্রেরি ও স্মৃতি সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হলে নতুন প্রজন্ম উপকৃত হবে।”

তিনি আরও জানান, আর্থিক সংকটের কারণে গত দুই বছর ধরে কানাই লাল শীলের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।

পরিবারের আক্ষেপ

বাদল চন্দ্র শীলের স্ত্রী মাধুরী শীল বলেন, “কেউ কখনো আমাদের খোঁজ নেয়নি। সরকারি কোনো উদ্যোগও নেই। শুধু আশ্বাসই শুনে যাচ্ছি।”

১৯৯৪ সালে নিজ গ্রামে পুনঃসমাধি

পরিবার সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর পর ঢাকার পোস্তখোলায় দাফন করা হলেও ১৯৯৪ সালে তাঁর দেহাবশেষ নিজ গ্রাম লস্করপুরে এনে পুনঃসমাধিস্থ করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি স্মৃতিফলক থাকলেও সেটিরও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নেই।

গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি

গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও স্থানীয় বিশিষ্টজনদের মতে, কানাই লাল শীল শুধু ফরিদপুরের নন, পুরো উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাঁর জন্মভিটাকে সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর, সংগীতচর্চা কেন্দ্র ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের মতে, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু মূল্যবান স্মৃতি চিরতরে হারিয়ে যাবে।

প্রশাসনের আশ্বাস

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানিয়েছেন, কানাই লাল শীলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি পরিদর্শন করে সংরক্ষণের সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “কানাই লাল শীল শুধু বাংলাদেশের নয়, উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান শিল্পী। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

লোকসংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। তবে তাঁর জন্মভিটা যদি অবহেলায় হারিয়ে যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসেরও এক অমূল্য অধ্যায়। তাই সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা—সরকার, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে কানাই লাল শীলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত করা হোক।

×
CLOSE X